আজকাল ওয়েবডেস্ক: হরমুজ প্রণালীতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টা পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইঙ্গিত দেন যে, সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি এখন 'বাতিল' বা 'শেষ' হয়ে গিয়েছে। তুরস্কে আয়োজিত ন্যাটো সম্মেলনে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ইরানের নেতাদের 'নীচ প্রকৃতির' ও 'বিকৃত মানসিকতার মানুষ' বলে অভিহিত করেন। ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানান যে, তিনি তেহরানের সঙ্গে আর কোনও আলোচনায় বা সম্পর্কে জড়াতে চান না।

মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প সাফ বলে দেন, "আমার কাছে ওই সমঝোতার আর কোনও অস্তিত্ব নেই। আমি ওদের সঙ্গে আর কোনও লেনদেন বা সম্পর্ক রাখতে চাই না।" ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর তেলের দাম তিন শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেলেও, বাস্তবে এর প্রভাব বা পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছিল। এই অস্থিরতার মূল কারণ হল হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের ২০ শতাংশই এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।

বুধবার ইরানের নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প বলেন, "তারা নীচ প্রকৃতির লোক। তারা বিকৃত মানসিকতার মানুষ। তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও হিংস্র। যদি তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকত, তবে তারা তা ব্যবহার করত।" যদিও ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, উভয় পক্ষের আলোচকরা চাইলে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু তিনি এই প্রক্রিয়াকে 'সময়ের অপচয়' বলে মনে করেন। প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন যে, এমন 'পাগল' বা 'অস্থির প্রকৃতির' লোকদের সঙ্গে আলোচনায় বসে বিশেষ কোনও লাভ নেই। ট্রাম্প বলেন, "আমি আমাদের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলব... তবে আমার মতে, ওদের সঙ্গে কোনও কিছু নিয়ে আলোচনা করা মানেই সময়ের অপচয়। ওরা মিথ্যাবাদী।"

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হামলা
মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ব্যাপক মাত্রায় হামলা চালানোর পর ওই অঞ্চলের শান্ত পরিস্থিতি প্রায় পুরোপুরি উবে যায়। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরানের তেল বিক্রির ওপর ফের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা 'অ্যাক্সিওস'-কে জানান যে, ৮০টিরও বেশি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে চালান এই হামলাগুলো ছিল মে মাসের পর ইরানে চালানো সবচেয়ে তীব্র আক্রমণ।

ইরান যখন তাদের প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনেইয়ের সপ্তাহব্যাপী শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পালন করছিল, ঠিক তখনই তাদের নজরদারি ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং বন্দরগুলোতেও হামলা চালানো হয়। মার্চ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনেই নিহত হয়েছিলেন।

মঙ্গলবার রাতে বন্দর আব্বাস, সিরিক এবং কেশম দ্বীপজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। মঙ্গলবার যেসব জাহাজে হামলা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ‘আল-রেকায়াত’, জাহাজটি ওমানের উপকূল হয়ে ভারতের দিকে যাচ্ছিল।

ওয়াশিংটনের আনা অভিযোগকে ইরান ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বলে অভিহিত করলেও, তারা আগেই ঘোষণা করেছিল যে হরমুজ হয়ে তাদের অনুমোদিত পথটিই কেবল নিরাপদ। ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার যেসব জাহাজে হামলা হয়েছিল, সেগুলো ওমান উপকূলের কাছাকাছি পথ ব্যবহার করছিল।

অন্যদিকে, এর জবাবে ইরান কুয়েত ও বাহরিনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করে। উল্লেখ্য, বাহরিনেই মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর মোতায়েন রয়েছে। ইরানের শক্তিশালী রেভল্যুশনারি গার্ডস একটি এমকিউ-৯ ড্রোনধ্বংস করার দাবিও করেছিল, তবে এ বিষয়ে কোনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

মার্কিন ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের এই আকস্মিক তীব্রতা বিশ্বকে আবারও উদ্বেগের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পারস্পরিক ছোটখাটো হামলা চললেও, যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য সমঝোতা স্বাক্ষরের পর থেকে এ পর্যন্ত দেওয়া সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য। গত সপ্তাহেই তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা কাতার সফর করেছিলেন। একের পর এক ঘটতে থাকা এসব ঘটনা আগে থেকেই জটিল হয়ে থাকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।