আজকাল ওয়েবডেস্ক: কুখ্যাত মার্কিন অর্থলগ্নিকারী ও দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার নথি প্রকাশ্যে আসায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। ২০০৮ সালে নাবালিকা যৌন নির্যাতনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও এপস্টিন কীভাবে বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতা, রাজপরিবারের সদস্য, কর্পোরেট দুনিয়ার শীর্ষ ব্যক্তিত্ব এবং তারকাদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা চালিয়ে গিয়েছিলেন তা এই নথিগুলির মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

‘এপস্টিন ফাইলস’ নামে পরিচিত এই নথিগুলি মার্কিন বিচার দপ্তরের (US Department of Justice) ওপর দীর্ঘদিনের চাপ এবং কংগ্রেসের স্বচ্ছতা সংক্রান্ত নির্দেশের পর প্রকাশ করা হয়। নথিগুলির মধ্যে রয়েছে বহু বছরের তদন্তে সংগৃহীত ছবি, ই-মেল, অডিও রেকর্ডিং এবং অন্যান্য প্রমাণমূলক উপাদান।

তবে নথি প্রকাশের মাত্র একদিনের মধ্যেই বিচার দপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে রহস্যজনকভাবে অন্তত ১৬টি নথি উধাও হয়ে যায়। কেন এই নথিগুলি সরানো হলো, সে বিষয়ে কোনও  ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। উধাও হওয়া নথিগুলির মধ্যে একটি ছবিতে দেখা গিয়েছিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প, জেফ্রি এপস্টিন এবং তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোগী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলকে, যে ছবিটি এপস্টিনের একটি সম্পত্তির ড্রয়ার থেকে উদ্ধার হয়েছিল।

কারা কারা রয়েছেন এপস্টিন ফাইলসে?

নথিগুলি থেকে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে যৌন পাচারের দায়ে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করা ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলকে কেন্দ্র করে এপস্টিনের চারপাশে ছিলেন বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি। তালিকায় রয়েছেন প্রাক্তন ও বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট, শীর্ষ রাজনীতিবিদ, ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য, ধনকুবের, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং বিনোদন জগতের বড় তারকারা।

বিনোদন জগতের যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন গায়ক-অভিনেত্রী ডায়ানা রস, পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসন, রোলিং স্টোনস ব্যান্ডের গায়ক মিক জ্যাগার এবং অস্কারজয়ী অভিনেতা কেভিন স্পেসি। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের এপস্টিন বা ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে অথবা বিল ক্লিনটনের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ছবিতে দেখা যায়।

ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্র্যানসনের একটি পুরনো ছবিও নথিতে রয়েছে, যেখানে এপস্টিনের সঙ্গে একাধিক মহিলাকে দেখা যায় যাঁদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।

ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রেক্ষাপটে ইয়র্কের ডাচেস সারাহ ফার্গুসনের একটি ছবিও সামনে এসেছে। তাঁর প্রাক্তন স্বামী প্রিন্স অ্যান্ড্রু এই ফাইলসে আরও ঘনঘন উপস্থিত। এপস্টিন কাণ্ডে অভিযোগকারিণী ভার্জিনিয়া জিউফ্রের অভিযোগের জেরে প্রিন্স অ্যান্ড্রু তাঁর রাজকীয় উপাধি হারান—যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

নথিতে সবচেয়ে বেশি বার যাঁদের দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ১৯৯০-এর শেষভাগ ও ২০০০-এর শুরুর দিকে এপস্টিন ও ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর একাধিক ছবি রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও এপস্টিনের অতীত সম্পর্ক ফের নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ল্যারি সামার্স, বর্তমান মার্কিন স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র, প্রাক্তন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসন, ইজরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক, প্রাক্তন জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত ও নিউ মেক্সিকোর গভর্নর বিল রিচার্ডসন এবং আন্তর্জাতিক শান্তি মধ্যস্থতাকারী জর্জ মিচেল।

প্রযুক্তি ও কর্পোরেট জগতের বড় নামগুলির মধ্যে রয়েছেন ইলন মাস্ক, বিল গেটস, রিড হফম্যান, পিটার থিয়েল, এল ব্র্যান্ডসের লেস ওয়েক্সনার এবং হেজ ফান্ড ধনকুবের গ্লেন ডুবিন।

সাংবাদিক মাইকেল উল্ফ ও চলচ্চিত্র পরিচালক উডি অ্যালেনের সঙ্গেও এপস্টিনের যোগাযোগের উল্লেখ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ২০০৮ সালের দণ্ডাদেশের পরেও তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাতের ইঙ্গিত মেলে।

এছাড়াও তালিকায় রয়েছেন সুপারমডেল নাওমি ক্যাম্পবেল, কোর্টনি লাভ, কৌতুক অভিনেতা ক্রিস টাকার, জাদুকর ডেভিড কপারফিল্ড, জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ পেগি সিগাল এবং দার্শনিক-চিন্তাবিদ নোম চমস্কি যাঁর নাম একাধিক ই-মেল ও চিঠিপত্রে পাওয়া গেছে।

আইনি ও আর্থিক জগতের যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের মধ্যে আছেন অ্যালান ডারশোভিৎজ, জেস স্ট্যালি, টম প্রিটজকার এবং ক্যাথরিন রুমলার। এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও কর্মীদের নামও উঠে এসেছে যেমন সারা কেলেন, আদ্রিয়ানা মুচিনস্কা, নাদিয়া মারচিনকোভা, এবং তাঁর ভাই মার্ক এপস্টিন।

ফ্যাশন ও মডেলিং দুনিয়ার ব্যক্তিত্ব জঁ-লুক ব্রুনেল, ফ্রেডেরিক ফেক্কাই, আলেকজান্দ্রা ফেক্কাই এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সদস্য মারলা ম্যাপলস ও টিফানি ট্রাম্পের নামও নথিতে রয়েছে।

নথিতে কারও নাম থাকা মানেই তিনি অপরাধে জড়িত এমন কোনও  প্রমাণ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক সাক্ষাৎ, যোগাযোগ বা তৃতীয় পক্ষের উল্লেখ হিসেবে নাম উঠে এসেছে।

উল্লেখ্য, জেফ্রি এপস্টিন ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে ফেডারেল যৌন পাচার মামলার বিচারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় রহস্যজনকভাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া যান যা আজও নানা প্রশ্ন ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দিয়ে চলেছে।