আজকাল ওয়েবডেস্ক: আমেরিকার এভারেট শহরের একটি হলুদ রঙের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুসান লগোথেটি এবং তাঁর দুই সহকর্মী। তাঁদের পরনে ছিল একটি চুইংগাম কোম্পানির প্রচারের টি-শার্ট, হাতে প্রচারপত্র। বাড়ির দরজা খুলে তাঁদের স্বাগত জানান পায়জামা পরা মিচেল গ্যাফ। নতুন স্বাদের চুইংগাম পরীক্ষার প্রস্তাবে রাজিও হয়ে যান তিনি। একের পর এক চুইংগাম চেখে দেখছিলেন গ্যাফ।

 

২০২৪ সালের জানুয়ারির সেই ঘটনার কথা মনে করে লগোথেটি পরে বলেন, গ্যাফ যখন আরেকটি নতুন স্বাদ চেখে দেখছিলেন, তখন তাঁর এক সহকর্মী একটি ছোট পাত্র এগিয়ে দেন। সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লগোথেটি বলেন, “আমি এখনও মনে করতে পারি, তিনি প্রথম টুকরো চুইংগাম চিবিয়ে সেই ছোট পাত্রে ফেললেন, আর তাতে তাঁর লালা লেগে ছিল। সেই মুহূর্তে উত্তেজনা চেপে রাখা আমার পক্ষে খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল।”

 

আসলে নিজের অজান্তেই ছদ্মবেশী তদন্তকারীদের হাতে নিজের ডিএনএ তুলে দিয়েছিলেন মিচেল গ্যাফ। ১৯৮৪ সালের একটি ধর্ষণ ও খুনের মামলার সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র নিশ্চিত করতে তদন্তকারীদের ডিএনএ নমুনার প্রয়োজন ছিল। গত মার্চে জমা পড়া আদালতের হলফনামায় এমনই তথ্য উঠে এসেছে।

 

৬৮ বছর বয়সী গ্যাফ পরে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় দোষ স্বীকার করেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, গত ১৬ এপ্রিল তিনি জুডি উইভার এবং সুসান ভেসি নামে দুই মহিলাকে ধর্ষণের পর খুন করার কথা স্বীকার করেন। বুধবার তাঁর সাজা ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। ১৯৮০ এবং ১৯৮৪ সালে ওয়াশিংটনে এই দুই খুনের ঘটনা ঘটেছিল। তবে দীর্ঘদিন তদন্তকারীরা এই দুই ঘটনাকে আলাদা ঘটনা বলেই মনে করেছিলেন। প্রতিটি মামলায় সন্দেহভাজনের ইঙ্গিত মিললেও, প্রমাণের অভাবে বিচারিক প্রক্রিয়া এগোয়নি।

 

জুডি উইভারকে ১৯৮৪ সালে এবং সুসান ভেসিকে তার চার বছর আগে, ১৯৮০ সালে খুন করা হয়েছিল। আদালতের নথি অনুযায়ী, উইভার হত্যাকাণ্ডের চার দশক পরে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা চুইংগাম থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। পরে সেই নমুনার সঙ্গে উইভারের দেহ থেকে পাওয়া প্রমাণের ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হয়। তদন্তকারীদের মতে, এই ডিএনএ-ই ছিল মামলার মোড় ঘোরানো সূত্র। পাশাপাশি, আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তি যে বহু পুরোনো অমীমাংসিত মামলারও সমাধান করতে পারে, এই ঘটনাও তার বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

 

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অন্ধকারে থাকা নিহতদের পরিবারও এই ঘটনায় কিছুটা মানসিক শান্তি পেয়েছে। তদন্তে জানা যায়, গ্যাফের হামলার শিকার হয়েছিলেন আরও এক মহিলা। তিনি প্রাণপণ লড়াই করে কোনওমতে বেঁচে ফিরেছিলেন। অভিযুক্তের পরিচয় প্রকাশ্যে আসায় তাঁর কাছেও বিষয়টি কিছুটা স্বস্তির। তদন্তকারী কর্মকর্তা লগোথেটি বলেন, “শেষ পর্যন্ত এই দুই খুনের রহস্যভেদ করতে যা দরকার ছিল, তা হল বিজ্ঞানের অগ্রগতি।”

 

১৯৮০ সালের জুলাইয়ে যখন সুসান ভেসিকে খুন করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১। বিবাহিত ভেসির দুই সন্তান ছিল, যাদের বয়স তখন দু’বছরেরও কম। আদালতে গ্যাফের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তিনি এলোমেলোভাবে বিভিন্ন বাড়ির দরজা খোলা আছে কি না, তা দেখছিলেন। ভেসির বাড়ির দরজা খোলা পেয়ে তিনি ভিতরে ঢুকে পড়েন। তারপর তাঁকে বেঁধে মারধর, ধর্ষণ এবং শেষে শ্বাসরোধ করে খুন করেন।

 

চার বছর পরে ৪২ বছর বয়সী জুডি উইভারের উপরেও হামলা চালান গ্যাফ। তিনিও সন্তানের মা ছিলেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, গ্যাফ উইভারের শোবার ঘরে তাঁকে আক্রমণ করেন এবং পরে প্রমাণ নষ্ট করতে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেন। নিজের জবানবন্দিতে গ্যাফ বলেন, “সেখান থেকে বেরোনোর আগে আমি তাঁর গলায় তার পেঁচিয়ে দিই। তারপর অপরাধ লুকোনোর জন্য বিছানার চাদরে আগুন লাগিয়ে দিই। এভাবেই তাঁকে হত্যা করি।”