আজকাল ওয়েবডেস্ক: অধিকৃত পশ্চিম তীরের কালান্দিয়া শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের একটি শিউরে ওঠার মতো ভিডিও সম্প্রতি সামনে এসেছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, একজন ইসরায়েলি সীমান্ত পুলিশ কর্মকর্তা তরুণ প্যালেস্তিনীয়দের বহনকারী একটি গাড়ির ভেতর সশব্দে বিস্ফোরিত হওয়া স্টান গ্রেনেড (যা তীব্র আলো ও শব্দ তৈরি করে মানুষকে দিশেহারা করে দেয়) ছুড়ে মারছেন। এই ঘটনার ভিডিওটি ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা 'বি’তসেলেম' প্রকাশ করার পর ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে এবং ইসরায়েলি পুলিশ এর একটি তদন্ত শুরু করেছে।

ভিডিওটিতে দেখা যায়, গত রবিবারের এই ঘটনার সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তা একটি গাড়ির দিকে এগিয়ে যান এবং ভেতরে থাকা আরোহীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে থাকেন। সামান্য কথাকাটাকাটির পরই ওই কর্মকর্তা তার বেল্ট থেকে একটি স্টান গ্রেনেড বের করেন এবং গাড়ির খোলা দরজা দিয়ে তা ভেতরে ছুড়ে মারেন। চালক গাড়ি থেকে নামার চেষ্টা করতেই কর্মকর্তাটি জোর করে দরজাটি আটকে দেন এবং চিৎকার করে বলতে থাকেন, "মুখ বন্ধ করো! কার সাথে এভাবে কথা বলছ?" এর কয়েক মুহূর্ত পরই গ্রেনেডটি গাড়ির ভেতরে বিস্ফোরিত হয় এবং পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। গাড়ির ভেতরে থাকা দুই আরোহী প্রাণভয়ে বিপরীত পাশের দরজা দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসেন। তারা যখন আত্মরক্ষার জন্য পালাচ্ছিলেন, তখন ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাদের দিকে রাইফেল তাক করে গুলি ছুড়ছেন বলেও ভিডিওতে দেখা যায়। মানবাধিকার সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে যে, গাড়ির ভেতরে থাকা তরুণেরা অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন।

ইসরায়েলি পুলিশ জানিয়েছে, ওই কর্মকর্তার আচরণ তাদের নির্ধারিত নিয়মনীতির বাইরে ছিল এবং বিচার মন্ত্রকের পুলিশ তদন্ত বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, স্টান গ্রেনেডগুলো মূলত মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ ও বধির করে দেওয়ার জন্য তৈরি হলেও, খুব কাছ থেকে বিস্ফোরিত হলে এগুলো মারাত্মক ও প্রাণঘাতী আঘাতের কারণ হতে পারে।

মানবাধিকার সংস্থা বি’তসেলেমের নির্বাহী পরিচালক ইউলি নোভাক এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, পশ্চিম তীরে প্যালেস্তিনীয় শিশু ও কিশোরদের এই নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড কোনও  বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত ইসরায়েলের সেই সামগ্রিক নীতির ফল, যেখানে কোনও  জবাবদিহিতা ছাড়াই প্যালেস্তিনীয়দের ওপর সহিংস নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালানোর অলিখিত ছাড় দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ১,১৭৫ জন প্যালেস্তিনীয় বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের এক-চতুর্থাংশই শিশু। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে একটি মৃত্যুর জন্যও কাউকে অভিযুক্ত বা শাস্তির আওতায় আনা হয়নি।

দুর্ভাগ্যবশত, কালান্দিয়া শিবিরের এই একই অভিযানের সময় ওয়ালিদ আবু স্নেনেহ নামের এক ১৬ বছরের প্যালেস্তিনীয় কিশোরকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন। প্যালেস্তাইন স্বাস্থ্য মন্ত্রকের  দেওয়া তথ্যমতে, এই ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে আরও দুটি প্যালেস্তিনীয় শিশুর পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কোনও  তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

একই দিন রাতের দিকে আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনায় আহমদ মারুফ জাইদ নামের মাত্র চার মাস বয়সী এক প্যালেস্তিনীয় শিশু মারা গেছে। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, সে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে ইসরায়েলি সেনারা তাদের চেকপোস্ট পার হতে দেয়নি, যেখানে একটি অ্যাম্বুলেন্স তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। বাধ্য হয়ে পরিবারটি পাহাড়ি ও কাঁচা রাস্তা দিয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে শিশুকে নিয়ে রামাল্লাহ হাসপাতালের দিকে রওনা হয়। এতে চিকিৎসা পেতে এক ঘণ্টারও বেশি দেরি হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি। যদিও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর (IDF) একজন মুখপাত্র চিকিৎসার জন্য যাওয়া ওই পরিবারটিকে আটকে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগেও রামাল্লায় আরেকটি সামরিক অভিযানের সময় আমির আহমদ জাবের নামের এক ১৫ বছর বয়সী কিশোরকে গুলি করে হত্যা করেছিল ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনের মাটিতে একের পর এক ঝরে যাওয়া এই অপ্রাপ্তবয়স্ক প্রাণগুলো এখন বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও মানবিক উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।