আজকাল ওয়েবডেস্ক: এক বছর আগেও রাজপথ ছিল তরুণদের দখলে। স্বৈরাচারের অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের জুলাই-অভ্যুত্থানে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী রাস্তায় নেমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটায়। সামাজিক মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে জেলা শহর—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয় বাংলাদেশের এই গণ-আন্দোলন, যাকে অনেকেই বলেছিলেন ‘জেন-জির বিপ্লব’।
কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ছবিটা যেন একেবারে অন্যরকম। রাজপথের সেই তরুণেরা আজ ভোটের লাইনে দাঁড়াতে প্রস্তুত হলেও, ক্ষমতার দৌড়ে এগিয়ে মূলত পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোই। তরুণদের একাংশের কথায়, “কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরোলে পাজি”—বিপ্লবের ঝড় থামতেই আবার পুরনো রাজনীতির দাপট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ বছরের শিক্ষার্থী সাদমান মুজতবা রাফিদ আন্দোলনের সময় পরিবারের আপত্তি ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বংশানুক্রমিক ক্ষমতার রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা দরকার। কিন্তু ভোটের আগে তাঁর কণ্ঠে এখন হতাশা স্পষ্ট। “আমরা এমন একটা দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম যেখানে লিঙ্গ, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ পাবে। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কার তো দূরের কথা, বাস্তবতা আমাদের স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে,” বলছেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রায় ১২.৮ কোটি ভোটারের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি ৩০ বছরের নিচে। এই জেন-জিই ছিল আন্দোলনের চালিকাশক্তি। কিন্তু ভোটের লড়াইয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন দু’টি পুরনো শিবির—খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং ইসলামপন্থী জামাত-ই-ইসলামী। জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত হলেও নানা বিতর্কে জর্জরিত এই দলগুলিই এগিয়ে।
অভ্যুত্থানের পর আন্দোলনের কয়েকজন মুখ মিলিয়ে গঠন করেন ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। অনেক তরুণের আশা ছিল, এই দলই হয়তো নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবে। কিন্তু ডিসেম্বরের শেষ দিকে এনসিপির সঙ্গে জামাতের কৌশলগত জোট বহু সমর্থককে হতাশ করে।
&t=10sজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩ বছরের প্রত্নতত্ত্বের ছাত্র শুদ্রুল আমিনের কথায়, “তারা নৈতিক জায়গা হারিয়েছে। যারা অতীতের বোঝা ছাড়া ‘নিউ বাংলাদেশ’ চেয়েছিল, তারা এখন বাধ্য হচ্ছে পুরনো শক্তি আর ছাত্র-ইসলামপন্থী জোটের মধ্যে বেছে নিতে।” ২৪ বছরের হিন্দু শিক্ষার্থী শামা দেবনাথও মনে করেন, রাজনীতি এখনও ‘এটা না ওটা’—এই সীমিত কাঠামোয় আটকে। “নতুন কোনও দিশা বা ভিশন দেখছি না,” বলছেন তিনি।
নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও তরুণদের একাংশের অভিযোগ, তারা হিংসা ও সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ২৩ বছরের বৌদ্ধ শিক্ষার্থী হেমা চাকমা বলেন, “জুলাই বিপ্লবের চেতনা যেন হারিয়ে গেছে। আগের পরিস্থিতি ভাল ছিল না, কিন্তু এখন হিংসা বেড়েছে। সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।”
অর্থনৈতিক হতাশাও রয়ে গেছে। কর্মসংস্থানের অভাব ও সুযোগের সংকটই ছিল আন্দোলনের বড় প্রেরণা। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান এখনও আসেনি বলে অভিযোগ। তবে হতাশার মধ্যেও ভোট নিয়ে উদ্দীপনা রয়েছে। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত—এমন তথ্য দিয়েছে একটি যুব নেতৃত্বভিত্তিক সংগঠনের সমীক্ষা। ৩০০ আসনের নির্বাচনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সংস্কার—প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়েও গণভোট হবে।
২৬ বছরের ছাত্র আন্দোলনকর্মী উমামা ফাতেমা মনে করেন, “মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছে—এটাই বড় কথা। একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত স্থিতিশীল সরকারই দেশকে এগিয়ে নিতে পারে।” কেউ কেউ বাস্তবতার নিরিখে বিএনপির দিকেই ঝুঁকছেন। ২৫ বছরের মাইশা মালিহা বলছেন, “নতুন ছাত্রদল আমাদের আশা ভেঙেছে। তাই এমন একটি শক্তিশালী দলকে ভোট দিতে চাই, যাদের মাঠপর্যায়ে সংগঠন আছে।” অন্যদিকে ২০ বছরের এরিশা তাবাসসুমের মত, “বিএনপিকে তো দেখেছি। জামাতকে একবার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।”
এনসিপি-তে যোগ দিয়ে পরে জামাত জোটের প্রতিবাদে বেরিয়ে আসা চিকিৎসক তাসনিম জারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। দরজায় দরজায় ঘুরে মনোনয়ন বৈধ করতে প্রয়োজনীয় ৫ হাজার স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন তিনি। “জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের মতো মানুষকে রাজনীতিতে প্রবেশের আশা দিয়েছিল। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এক দিনে তৈরি হবে না, কিন্তু সম্ভাবনা আছে,” বলছেন ৩১ বছরের জারা। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এইচ এম আমিরুল করিমও আশাবাদী, “এখন না হলেও একদিন নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর স্বপ্ন বাস্তব হবে। আমি হাল ছাড়তে রাজি নই।”
বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রাক্কালে তাই চিত্রটা জটিল—একদিকে বিপ্লবী আবেগের হ্রাস, অন্যদিকে ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনের প্রত্যাশা। জেন-জি হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রে জায়গা করে নিতে পারেনি, কিন্তু তারা যে রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে—সে কথা অস্বীকার করা কঠিন। এখন দেখার, ব্যালট বাক্স কি সেই স্বপ্নকে নতুন দিশা দেখাতে পারে, নাকি পুরনো শক্তির হাতেই আবার ক্ষমতার পাল্লা ভারী হয়।
