আজকাল ওয়েবডেস্ক: অসমের গুয়াহাটির গণেশগুড়ি উড়ালপুলের নিচে আঁকা প্রয়াত সাংস্কৃতিক আইকন জুবিন গর্গের একটি দেয়ালচিত্র বা মুরাল মুছে ফেলাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কের জেরে খোদ আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এক বিস্ফোরক ও বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেছেন। তিনি বলেছেন, আসামের মানুষ যদি জনসমক্ষে কোনও বিপ্লবীর ছবিই আঁকতে চান, তবে মার্ক্সবাদী বিপ্লবী চে গুয়েভারার চেয়ে উলফা (আই) প্রধান পরেশ বড়ুয়ার ছবি আঁকা অনেক ভালো। ভারতের কাছ থেকে অসমের স্বাধীনতা বা বিচ্ছিন্নতার দাবিতে কয়েক দশক ধরে সশস্ত্র সংগ্রাম চালানো একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রধানকে একজন দায়িত্বরত মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এভাবে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দেওয়ার ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই দেশজুড়ে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন অসমের কোটি কোটি মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গায়ক ও অভিনেতা জুবিন গার্গ, যিনি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিঙ্গাপুরে জলে ডুবে মারা যান। তাঁর অকাল প্রয়াণে পুরো অসম জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল এবং তাঁর শেষকৃত্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মানুষের ঢল নেমেছিল। সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির অসম সফরের প্রস্তুতি হিসেবে গুয়াহাটি শহরের সৌন্দর্যবর্ধন অভিযানের অংশ হিসেবে জুবিনের ওই দেয়ালচিত্রটি মুছে ফেলা হয়, যদিও শেষ পর্যন্ত জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সেই সফর বাতিল হয়ে যায়। এই ঘটনায় জুবিন অনুরাগী এবং তাঁর স্ত্রী গরিমা সাইকিয়া গর্গ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, জুবিনের ছবি কি গুয়াহাটি শহরকে নোংরা করছিল নাকি এই শহরে তাঁর কোনও প্রয়োজনই নেই? তীব্র প্রতিবাদের মুখে দেয়ালচিত্রটির মূল শিল্পী মার্শাল বড়ুয়া আবারও জুবিনের একটি নতুন ছবি সেখানে ফুটিয়ে তোলেন।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন যে, যারা জুবিনের ছবি মুছেছিলেন তারা খাঁটি অসমীয়া এবং জুবিনেরই ভক্ত। পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে তারা জানিয়েছেন, ছবিটির অবয়ব জুবিন গার্গের মতো না লেগে বরং চে গুয়েভারার মতো লাগছিল বলেই তারা সেটি মুছে দিয়েছিলেন। শিল্পী মার্শাল বড়ুয়া বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর সদস্য বলে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করলেও, মার্শাল নিজে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও দিয়ে তা অস্বীকার করেছেন। মাথায় চে গুয়েভারার মতো টুপি পরা মার্শাল জানান, কোনও রাজনৈতিক দলের সাথে তাঁর যোগ নেই। চে গুয়েভারা একজন চরম রোমান্টিক মানুষ ছিলেন বলেই তিনি চে'কে ভালোবাসেন, কারণ রোমান্টিক না হলে মানুষের জন্য এভাবে কেউ লড়াই করতে পারে না।
আশ্চর্যের বিষয় হল, শিল্পীর এই চে-প্রেমের বিরোধিতা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা চে গুয়েভারা ও কিউবাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি কিউবা ঘুরে এসেছেন এবং সেখানে দেদার ড্রাগসের কারবার চলে, কোনও রাস্তাঘাট বা জল সরবরাহ নেই, এমনকি ভারতের দূতাবাস চলে একটিমাত্র সৌর প্যানেলের ওপর ভরসা করে। কিউবার সাথে অসমের কোনও তুলনাই চলে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সাথে তিনি বলেন, তিনি নিজে হয়তো পরেশ বড়ুয়াকে মেনে নেন না বা তাঁর নিন্দা করেন, কিন্তু অসমের দেয়ালে যদি বিপ্লবীর ছবি আঁকতেই হয়, তবে তা কোনও বিদেশি বিপ্লবীর না হয়ে অসমীয়া বিপ্লবীর হওয়া উচিত। একজন বামপন্থী শিল্পীকে কোণঠাসা করতে গিয়ে ভারতের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক চরমপন্থী নেতাকে পরোক্ষভাবে তুলে ধরায় এখন খোদ মুখ্যমন্ত্রীর দিকেই আঙুল উঠছে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে জুবিন গার্গের ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রী গরিমা সাইকিয়ার অনুমোদিত একটি নির্দিষ্ট পোর্ট্রেট ব্যবহার করারও ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।















