আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতে এই প্রথম ক্যাপ্টাগন ট্যাবলেট বাজেয়াপ্ত করেছে নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি)। এই মাদককে প্রায়শই 'জিহাদি মাদক' বা 'গরিবের কোকেন' বলে অভিহিত করা হয়। যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, 'অপারেশন রেজপিল'-এর অংশ হিসেবে নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি) গুজরাটের মুন্দ্রা বন্দর এবং দিল্লির নেব সরাই এলাকা থেকে ১৮২ কোটি টাকা মূল্যের ক্যাপটাগন ট্যাবলেট বাজেয়াপ্ত করেছে।
অমিত শাহ জানান, এই মাদকদ্রব্যগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাচারের উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছিল। এই ঘটনায় এক বিদেশি নাগরিককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃত সিরীয় নাগরিক বলে জানা গিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টুইট করে বলেন, "মোদি সরকার একটি 'মাদকমুক্ত ভারত' গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। আমাদের সংস্থাগুলো প্রথমবারের মতো ক্যাপটাগন (তথাকথিত 'জিহাদি মাদক') বাজেয়াপ্ত করার এই সাফল্য অর্জন করেছে।"
'জিহাদি মাদক' ক্যাপটাগন আসলে কী?
যে বিষয়টি সবার বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, তা হল এর ডাকনাম—'জিহাদি মাদক'। যেহেতু ক্যাপটাগন উৎপাদন খরচ অত্যন্ত কম, তাই এটি 'গরিবের কোকেন' হিসেবেও পরিচিত। এটি অত্যন্ত আসক্তি সৃষ্টিকারী একটি উদ্দীপক, যা সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বারবারই নজরে এসেছে। সিরীয় গৃহযুদ্ধের সময় ইসলামিক স্টেটের সন্ত্রাসবাদীরা দীর্ঘক্ষণ জেগে থাকা, ভয় দমন করা এবং কর্মচঞ্চল থাকার উদ্দেশ্যে এই মাদকটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করত। আর এ কারণেই ক্যাপটাগনকে 'জিহাদি মাদক' হিসেবে আখ্যায়িত করা শুরু হয়।
বাজেয়াপ্ত মাদক উপসাগরীয় অঞ্চলের উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছিল। উপসাগরীয় অঞ্চলটি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। এই বিষয়টি থেকে ধারণা করা যায় যে, মাদকগুলো সম্ভবত ওই সংঘাতের সঙ্গে জড়িত যোদ্ধাদের জন্যই পাঠানো হচ্ছিল।
তবে ক্যাপটাগন কোনও নতুন মাদক নয়। এর মূল রূপটি 'ফেনেথাইলিন' নামে পরিচিত ছিল এবং ১৯৬০-এর দশকে মনোযোগের ঘাটতি বা নারকোলেপসির (অত্যধিক ঘুমজনিত ব্যাধি) মতো শারীরিক সমস্যাগুলোর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এর তীব্র আসক্তি সৃষ্টিকারী বৈশিষ্ট্য এবং অপব্যবহারের ব্যাপক ঝুঁকির কারণে ১৯৮০-এর দশকে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ এটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
পরবর্তীতে রাষ্ট্রসংঘ 'সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস বিষয়ক কনভেনশন'-এর 'তফসিল-২'-এর অন্তর্ভুক্ত করে। মূলত মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সৃষ্টিকারী বা সাইকোঅ্যাক্টিভ মাদকদ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যেই এই চুক্তিটি প্রণয়ন করা হয়েছিল।
ক্যাপটাগন কেন ব্যবহার করা হয়?
বর্তমানে কালোবাজারে যে 'জিহাদি মাদক'টি বিক্রি হচ্ছে, তা এর মূল বা আদি রূপ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এগুলো গোপনে গবেষণাগারে তৈরি করা হয় এবং এতে অ্যাম্ফিটামিন, ক্যাফেইন, মেথঅ্যাম্ফিটামিন এবং অন্যান্য কৃত্রিম রাসায়নিকের মিশ্রণ থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাদকের সামান্য পরিমাণ সেবনও অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে জেগে থাকতে পারেন, তাদের ক্ষুধা ও ক্লান্তি বোধ কমে যায় এবং তারা হঠাৎ করেই বিপুল শক্তির প্রবাহ অনুভব করেন।
এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোও সমানভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এটি আগ্রাসী মনোভাব, হিসামূলক আচরণ এবং বেপরোয়া কার্যকলাপের জন্ম দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে, এর একটানা ব্যবহার মানসিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ক্যাপ্টাগনের বিশাল মজুদ খুঁজে পায় বলে খবর পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় যে, ক্যাপ্টাগন পাচারের মাধ্যমে অর্জিত বিপুল মুনাফা সংগঠিত অপরাধ চক্র এবং উগ্রবাদী নেটওয়ার্কগুলোকে অর্থ যোগাতে করতে ব্যবহার হয়। আর ঠিক এই কারণেই, ভারতে প্রথমবারের মতো এই 'জিহাদি মাদক' বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনা গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।















