আজকাল ওয়েবডেস্ক: নির্বাচন কমিশন গত মঙ্গলবার উত্তরপ্রদেশের খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। খসড়া তালিকা অনুযায়ী, রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২.৫৫ কোটি। কিন্তু প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এই তালিকা ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। কংগ্রেস নেতা গুরুদীপ সিং সপ্পালের অভিযোগ, ঠিকানা পরিবর্তনের কারণেই তাঁর এবং তাঁর পরিবারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে যা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়ার একটি গুরুতর কাঠামোগত ত্রুটিকে সামনে এনেছে বলে বিরোধীদের দাবি।

কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য সপ্পাল জানিয়েছেন, সাহিবাবাদ থেকে নয়ডায় বাসস্থান বদলানোর পর তাঁর পরিবারের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নিয়ে তিনি লেখেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁকে জানিয়েছেন যে SIR-এর আওতায় ঠিকানা বদলানো ভোটারদের নাম তালিকায় রাখার কোনও নিয়ম  নেই।

সপ্পালের কথায়, “এর অর্থ হল, কোনও ভোটার বাসস্থান বদলালেই তার নাম সরাসরি ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। আমার মতো কোটি কোটি প্রকৃত ভোটার রয়েছেন।” যদিও তিনি জানিয়েছেন যে ফর্ম-৬ জমা দিয়ে আবার  নাম নথিভুক্ত করা সম্ভব, তবু তিনি প্রশ্ন তুলেছেন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সাধারণ ভোটারদের কতজন বাস্তবে এই জটিল প্রক্রিয়া শেষ  করতে পারবেন? তাঁর মতে, “এটাই SIR-এর বাস্তব চিত্র।”

এই অভিযোগ সামনে আসার সময়েই নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য দেখাচ্ছে সংশোধনের ভয়াবহ মাত্রা। উত্তরপ্রদেশে মোট ২.৮৯ কোটি ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১৮.৭ শতাংশ, দেশের কোনও রাজ্যে এই হার সর্বোচ্চ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৪৬.২৩ লক্ষ ভোটারকে (২.৯৯ শতাংশ) মৃত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি, ২.১৭ কোটি ভোটার (১৪.০৬ শতাংশ) তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন এই যুক্তিতে যে তাঁরা তাঁদের পূর্ববর্তী বাসস্থান ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছেন। আরও বহু নাম বাদ দেওয়া হয়েছে ‘অনুপস্থিত’, ‘সন্ধান মেলেনি’ কিংবা একাধিক জায়গায় নাম নথিভুক্ত থাকার অভিযোগে।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নবদীপ রিনওয়া জানিয়েছেন, বুথ লেভেল অফিসারদের (BLO) ঘরে ঘরে যাচাইয়ের ভিত্তিতেই এই বাদ দেওয়ার কাজ হয়েছে। তাঁর দাবি, “এই ভোটাররা হয় স্থায়ীভাবে তাঁদের আগের ঠিকানা ছেড়েছেন, নয়তো সংশ্লিষ্ট এলাকায় তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, অথবা ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে প্রয়োজনীয় ফর্ম জমা দেননি।”

তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে যাঁদের নাম এখনও খসড়া তালিকায় রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি। তাঁর কথায়, প্রায় ৮.৫ শতাংশ ভোটারের তথ্য ‘ম্যাপিং’ করা সম্ভব হয়নি। এই ভোটারদের এখন আলাদা করে নোটিশ পাঠানো হবে, যেখানে চূড়ান্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে কী কী নথি প্রয়োজন, তা উল্লেখ থাকবে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৬ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দাবি ও আপত্তি গ্রহণ করা হবে। এই আবেদনগুলির নিষ্পত্তি চলবে ২৬ জানুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সব শেষে, ৬ মার্চ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। উল্লেখযোগ্যভাবে, কমিশন আগেই খসড়া তালিকা প্রকাশের দিন ৩১ ডিসেম্বর থেকে পিছিয়ে ৬ জানুয়ারি করেছিল।

সপ্পালের ঘটনার পর বিরোধী দলগুলি অভিযোগ তুলেছে যে SIR মূলত সেইসব ভোটারদের বাদ দিচ্ছে, যাঁরা কাজ, শিক্ষা বা বাসস্থানের প্রয়োজনে স্থানান্তরিত হন। সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন, যেখানে বহু ভোটার অভিযোগ করছেন যে তাঁদের নাম হঠাৎ করেই খসড়া তালিকা থেকে উধাও হয়ে গেছে।

অখিলেশ যাদব বলেন, “ভোটারদের ক্ষোভ আন্দোলনে পরিণত হওয়ার আগেই নির্বাচন কমিশনের উচিত মৈনপুরি সহ বিভিন্ন জায়গায় ভুল করে বাদ দেওয়া প্রকৃত ভোটারদের নাম অবিলম্বে সংশোধন করা।”

উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অজয় রাই আরও কড়া ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, প্রায় ১.১৩ কোটি গণনা ফর্ম ফেরত আসেনি। তিনি বলেন, “২.৮৯ কোটি ভোটারকে বাদ দেওয়া একটি গুরুতর বিষয়। এর পিছনে বড় কোনও ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত হওয়া উচিত।”

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় আকারের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে পরিযায়ী শ্রমিক, ভাড়াটে বাসিন্দা, শহুরে দরিদ্র মানুষ এবং তরুণ ভোটারদের। ঘরে ঘরে শারীরিকভাবে যাচাই এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার ওপর নির্ভরশীল এই ধরনের ইনটেনসিভ রিভিশনে বহু প্রকৃত ভোটার অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

৮০ জন সাংসদ পাঠানো উত্তরপ্রদেশ প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। ফলে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাগরিকের বাদ পড়া শুধু প্রশাসনিক নয়, গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। আগামী কয়েক সপ্তাহে দাবি ও আপত্তি নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে মূল প্রশ্নটি থেকেই যাবে, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন কি প্রকৃত ভুল সংশোধন করবে, নাকি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারকে কার্যত বাইরে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কাকে আরও জোরালো করবে?