আজকাল ওয়েবডেস্ক: রেলগাড়ির চাকা বৃষ্টি বা ভেজা অবস্থায় খুব কমই পিছলে যায়। এটাই রেল পরিবহনের অন্যতম প্রকৌশলগত বিস্ময়। অনেকেই মনে করেন জল পড়লে স্টিলের চাকা ও রেলের ওপর ঘর্ষণ কমে যায়। বাস্তবে দেখা যায়, স্টিল-অন-স্টিল ঘর্ষণ ভেজা অবস্থায়ও যথেষ্ট উচ্চ তাপমাত্রায় থাকে। বৃষ্টির মাঝে ট্রেনের স্থিতিশীল চলাচলের পেছনে রয়েছে ওজন, ঘর্ষণ, প্রকৌশল, এবং আধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থার নিখুঁত সমন্বয়।
ট্রেনের বিশাল ওজন: স্থায়ী গ্রিপের প্রধান উপাদান
একটি সাধারণ মালবাহী ট্রেনের ওজন ১০০ টন বা তারও বেশি। এই বিশাল ওজন রেলের ওপর যে নিচের দিকে চাপ প্রয়োগ করে, সেটা চাকা ও রেলের মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী ঘর্ষণ সৃষ্টি করে। ভেজা রেলপথেও এই ঘর্ষণ ০.৩৫ থেকে ০.৫ পর্যন্ত থাকে, যেখানে ভেজা রাস্তায় গাড়ির টায়ারের ঘর্ষণ সহগ মাত্র ০.১। অর্থাৎ, শুধু ওজনই ট্রেনের পিছলে যাওয়া রোধ করতে বড় ভূমিকা পালন করে।
শুষ্ক স্টিলের ঘর্ষণ অবিশ্বাস্যভাবে বেশি
ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা যায়, শুষ্ক স্টিল চাকার সাথে স্টিল রেলের ঘর্ষণ ০.৭৮ পর্যন্ত পৌঁছায়, যা রাবারের টায়ারের তুলনায় অনেক বেশি। ভেজা অবস্থায়ও ঘর্ষণ এতটাই থাকে যে স্বাভাবিক ট্রেন চলাচলে কোনো সমস্যা হয় না।
বৃষ্টি আসলে রেলকে পরিষ্কার করে
আশ্চর্যজনকভাবে, হালকা ভেজা অবস্থা বা কুয়াশাচ্ছন্ন রেলপথ বৃষ্টির চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। কারণ তখন পাতার রস, তেল, ধুলো ও দূষিত স্তর জলের সাথে মিশে পাতলা, পিচ্ছিল ফিল্ম তৈরি করে। কিন্তু প্রবল বৃষ্টি হলে এই ময়লা ধুয়ে গিয়ে রেলপথ পরিষ্কার হয়ে যায়, ফলে গ্রিপ বাড়ে।
দূষণই প্রকৃত বিপদের কারণ
শুধু জল খুব কমই বিপজ্জনক। পাতার স্তর, তেল বা শিল্পকারখানার ধুলো যখন রেলের ওপর জমে, তখন তা ঘর্ষণকে ০.০৫ পর্যন্ত নামিয়ে আনতে পারে। এই অবস্থায় ট্রেনের টান ক্ষমতা ৩৫০ কিলোনিউটন থেকে মাত্র ৫০ কিলোনিউটনে নেমে আসে। তখন ট্রেন ধীরে চলে বা স্যান্ডিং ব্যবস্থা ব্যবহার করে।
স্টিক ও স্লিপ: নিয়ন্ত্রিত “ক্রিপ” সিস্টেম
ট্রেনের চাকা রেলের ওপর পুরোপুরি আটকে থাকে না, আবার পুরোপুরি পিছলেও যায় না। চাকা ও রেল সংযোগস্থলে দুটি অঞ্চল থাকে। একটি “স্টিক” অঞ্চল যেখানে কোনও স্লিপ নেই, ও একটি “স্লিপ” অঞ্চল যেখানে খুব ক্ষুদ্র পরিমাণে পিছলানো ঘটে। এই মাইক্রো-স্লিপ বা “ক্রিপ” ট্রেনকে স্থিতিশীলভাবে চলতে সাহায্য করে। সর্বোচ্চ টান অবস্থায় চাকা প্রতি কিলোমিটারে মাত্র ১৫ মিলিমিটার পিছলায় অর্থাৎ কোনও স্লিপ হয় না।
স্যান্ডিং সিস্টেম: ঘর্ষণ বাড়ানোর তাৎক্ষণিক সমাধান
ট্রেনে বিশেষ স্যান্ডবক্স থাকে, যেখান থেকে চাকার সামনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বালি ছাড়া যায়। বালি পড়লে ঘর্ষণ ০.১–০.২ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বর্ষায়, পাতাঝরার সময় বা খাড়া ঢালে এটি বিশেষভাবে কার্যকর।
স্বয়ংক্রিয় স্লিপ শনাক্তকরণ
আধুনিক লোকোমোটিভে সেন্সর থাকে যা চাকার স্লিপ হওয়া মাত্রই শনাক্ত করে। তখন ইঞ্জিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি কমিয়ে দেয়, ফলে চাকা আবার স্বাভাবিক গ্রিপ ফিরে পায়।
সব মিলিয়ে দেখা যায়—ট্রেনের ওজন, স্টিল-অন-স্টিল ঘর্ষণ, বৃষ্টির পরিষ্কার করার ক্ষমতা, স্যান্ডিং প্রযুক্তি এবং আধুনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মিলেই বৃষ্টির মধ্যে ট্রেন সাধারণত পিছলে যায় না। শুধুমাত্র দূষিত পাতার স্তর বা তেলের আবরণযুক্ত চরম পরিস্থিতিতে কিছুটা স্লিপ হতে পারে, তবে সেটাও নিয়ন্ত্রিত এবং নিরাপদ থাকে।
