আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রায় প্রদান করে দেশের নির্বাচনী অধিকারের আইনি অবস্থানকে পুনরায় স্পষ্ট করেছে। রাজস্থানের জেলা দুগ্ধ ইউনিয়ন সংক্রান্ত একটি মামলার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বিচারপতি বি.ভি. নাগরত্ন এবং বিচারপতি আর. মহাদেবনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ভোট দেওয়ার অধিকার বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার—কোনোটিই ভারতীয় সংবিধানের আওতায় মৌলিক অধিকারের মর্যাদা পায় না। আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, এই দুটি অধিকারই সম্পূর্ণভাবে বিধিবদ্ধ বা আইনি অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত সীমাবদ্ধতার ওপর ভিত্তি করেই এগুলি কার্যকর হয়।
লাইভ ল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচারপতি আর. মহাদেবনের লেখা এই রায়ে বলা হয়েছে যে, ভোটদান এবং নির্বাচনে দাঁড়ানো সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। ভোটদান হলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের একটি প্রাথমিক মাধ্যম, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা একটি অতিরিক্ত বিশেষ সুযোগ। তাই নির্বাচনে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে যোগ্যতা এবং যোগ্যতাহীনতার যে কঠোর নিয়মাবলি থাকে, তাকে কোনোভাবেই ব্যক্তির মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা যাবে না। আদালত জ্যোতিন বসু বনাম দেবী ঘোষাল এবং জাভেদ বনাম হরিয়ানা রাজ্যের মতো পুরনো মামলার নজির টেনে বলেছে, কোনো আইনের মাধ্যমে যদি প্রার্থী হওয়ার ওপর নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করা হয়, তবে তা অসাংবিধানিক নয়।
এই মামলার প্রেক্ষাপট ছিল রাজস্থানের সমবায় দুগ্ধ ইউনিয়নগুলির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন সংক্রান্ত কিছু নিয়মাবলি। সেখানে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে কারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। রাজস্থান হাইকোর্ট আগে এই নিয়মগুলিকে বাতিল ঘোষণা করেছিল, যা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়। শীর্ষ আদালত মনে করছে, হাইকোর্ট ভোট দেওয়ার অধিকার এবং নির্বাচনে লড়াই করার অধিকারের মধ্যে পার্থক্য করতে ভুল করেছে। সুপ্রিম কোর্টের মতে, এই নিয়মগুলি শুধুমাত্র কারা প্রার্থী হতে পারবেন তা নির্ধারণ করেছে, কিন্তু কারোর ভোট দেওয়ার অধিকারে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি। ফলে হাইকোর্টের যুক্তিটি আইনগতভাবে ধোপে টেকে না।
আদালত আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় স্পষ্ট করেছে, তা হলো 'যোগ্যতা' এবং 'অযোগ্যতার' মধ্যে পার্থক্য। হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট উপবিধি বা বাই-লগুলিকে প্রার্থীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক ধরণের অযোগ্যতা হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যা হলো, এগুলি আসলে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি ন্যূনতম মানদণ্ড। কোনো সোসাইটি বা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং দক্ষতার জন্য নিজস্ব বাই-ল তৈরি করতেই পারে, যা সংশ্লিষ্ট আইনের পরিপন্থী নয়। রাজস্থান কো-অপারেটিভ সোসাইটি অ্যাক্ট ২০০১ অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের পাশাপাশি সোসাইটিগুলোরও নিজেদের শাসন পরিচালনার জন্য নিয়ম তৈরির ক্ষমতা রয়েছে।
সবশেষে, সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের বিচার প্রক্রিয়ার পদ্ধতিগত ত্রুটিরও সমালোচনা করেছে। আদালত বলেছে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শোনার প্রয়োজন ছিল। সমস্ত জেলা দুগ্ধ ইউনিয়নকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই এমন রায় প্রদান করা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। 'অডি অল্টারাম পার্টেম' বা 'উভয় পক্ষের কথা শোনার' যে প্রাচীন আইনি প্রথা রয়েছে, তা এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে করছে শীর্ষ আদালত। সামগ্রিকভাবে, এই রায়টি ভারতের নির্বাচনী আইনের ইতিহাসে একটি শক্তিশালী দলিল হয়ে থাকবে, যা স্পষ্ট করে দিল যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আইনের কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং একে মৌলিক অধিকারের সাথে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।















