আজকাল ওয়েবডেস্ক: সময়ের চাকা ঘুরতে সময় লাগে না- তাই যেন ফের প্রমাণিত হল। ২০২৪ সালে যে মানুষটি নিট ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন, পড়ুয়াদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে যিনি নিজেকে 'ত্রাতা'-র ভূমিকা পালন করেছিলেন, আজ তিনিই গরাদের আড়ালে।২০২৬ সালের নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে গ্রেফতার মহারাষ্ট্রের লাতুরের বিখ্যাত 'রেনুকাই কেমিস্ট্রি ক্লাসেস'-এর প্রতিষ্ঠাতা শিবরাজ রঘুনাথ মোতেগাঁওকর। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই-এর হাতে সম্প্রতি ধরা পড়লেন এই শিক্ষক। পড়ুয়াদের কাছে যিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় 'এম স্যার' নামেই পরিচিত।

 

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর, গত রবিবার শিবরাজ মোতেগাঁওকরের বিভিন্ন ঠিকানায় তল্লাশি চালায় সিবিআই। সেই সময় তাঁর মোবাইল ফোন থেকেই উদ্ধার হয় ২০২৬ সালের নিট ইউজি পরীক্ষার ফাঁস হওয়া একটি প্রশ্নপত্র। এর পরেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

 

সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর, শিবরাজের গ্রেফতারির পর সমাজমাধ্যমে তাঁর ২০২৪ সালের একটি পুরনো ভিডিও নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। ওই বছর যখন দেশজুড়ে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তুমুল বিতর্ক ও আন্দোলন চলছিল, তখন শিবরাজ পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। একটি গাড়ি থেকে রেকর্ড করা সেই ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, পড়ুয়াদের উপর হওয়া এই 'ভয়াবহ অবিচারের' বিরুদ্ধে তিনি ঔরঙ্গাবাদ হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করবেন।

 

ওই ভিডিওতে তিনি আরও বলেন, "মহারাষ্ট্রের পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে এই কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে আমাদের একটি গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য আমরা বম্বে হাইকোর্টে যাচ্ছি। প্রয়োজনে মহারাষ্ট্রের সমস্ত সংবাদমাধ্যমের সাহায্য নেব।" ঘটনাচক্রে, যে প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে তিনি সেবার আন্দোলন গড়ে তোলার ডাক দিয়েছিলেন, দু’বছর পর সেই একই অপরাধে তাঁর নিজের ফোনেই মিলল প্রশ্ন ফাঁসের নথি।

 

জানা গিয়েছে, মহারাষ্ট্রের লাতুরের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম শিবরাজ রঘুনাথ মোতেগাঁওকরের। নব্বই দশকের শেষের দিকে সাইকেলে চড়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহশিক্ষকতা করে তাঁর পেশাজীবনের সূচনা। এরপর একটি ভাড়া ঘরে মাত্র ১০ জন ছাত্র নিয়ে তিনি শুরু করেন নিজস্ব কোচিং ক্লাস। নিজে হাতে নোট তৈরি করা থেকে শুরু করে পড়ুয়াদের পেছনে কঠোর পরিশ্রম— অল্প দিনেই লাতুরে কেমিস্ট্রি শিক্ষক হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা পান 'এম স্যার'।

 

ধীরে ধীরে সেই ছোট কোচিং এক বিরাট সাম্রাজ্যের রূপ নেই। বর্তমানে মহারাষ্ট্র জুড়ে 'আরসিসি ক্লাস'-এর মোট ৯টি শাখা রয়েছে। যেখানে প্রতি বছর প্রায় ৪০,০০০ শিক্ষার্থী নিট, জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা এবং সিইটি-র মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ৬৮ হাজারেরও বেশি। ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ এবং নিজস্ব অ্যাপের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে যেতেন তিনি।

 

২০২৪ সালের সেই ‘ছাত্রদরদী’ শিক্ষকের এমন রূপ পরিবর্তনের খবর সামনে আসতেই হতবাক শিক্ষা মহল এবং লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি প্রতিবাদের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল অপরাধের এই জাল? ঘটনার জল আরও কতদূর গড়ায়, এখন সেটাই দেখার।