আজকাল ওয়েবডেস্ক: নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগে সরাসরি থানায় না গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ব্যক্তিগত অভিযোগ দায়ের—এই পদক্ষেপকেই “বিচারিক পদমর্যাদার জঘন্যতম অপব্যবহার” বলে কড়া ভর্ৎসনা করল দেশের শীর্ষ আদালত।

বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানায়, একজন বিচারিক আধিকারিক ব্যক্তিগত বিরোধে নিজের পদমর্যাদা ব্যবহার করে ফৌজদারি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন না। শুনানির সময় আদালত মন্তব্য করে, “এটি বিচারিক দপ্তরের জঘন্যতম অপব্যবহার। বিচারককে বাড়ি পাঠানো উচিত।”

শীর্ষ আদালত এই মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে এবং বিচারিক আধিকারিকের করা আপিল খারিজ করে দেয়। শেষপর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিচারক নিজেই তাঁর আবেদন প্রত্যাহার করে নেন।

ঘটনার সূত্র ৬ জানুয়ারি ২০২২। ওই বিচারিক আধিকারিক একটি ব্যক্তিগত অভিযোগ (private complaint) দায়ের করেন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তাঁর ভাই তাঁর স্বাক্ষর জাল করে এবং একটি ভুয়ো আদালতের সিল ব্যবহার করে আন্নামালাই বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া একটি এলএলএম গবেষণাপত্রে প্রতারণা করেছেন।

অভিযোগের ভিত্তিতে ম্যাজিস্ট্রেট ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৬৮ (জালিয়াতির উদ্দেশ্যে জাল দলিল প্রস্তুত) এবং ৪৭১ (জাল দলিল ব্যবহার) ধারায় অভিযোগ গ্রহণ করে সমন জারি করেন। এরপর অভিযুক্ত ভাই কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। হাইকোর্ট পুরো ফৌজদারি কার্যক্রম—অভিযোগ গ্রহণের আদেশ এবং সমন—সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দেয়।

&t=21s

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করে, ব্যক্তিগত বিরোধে একজন বিচারক তাঁর সরকারি পদ ব্যবহার করে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন, যা বিচারিক শালীনতা ও নীতির পরিপন্থী। আদালত আরও নির্দেশ দেয়, এই রায়ের অনুলিপি যেন সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়, যাতে প্রশাসনিক স্তরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

এই রায়ে অসন্তুষ্ট হয়ে বিচারিক আধিকারিক শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁর তরফে আইনজীবী দিলীপ আন্নাসাহেব তাউর যুক্তি দেন, তিনি একজন জালিয়াতির শিকার ব্যক্তি হিসেবে অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং আইন কোথাও নিষেধ করেনি যে একজন বিচারক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ব্যক্তিগত অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন না।

অন্যদিকে প্রতিপক্ষের পক্ষে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী শ্রী সূর্যানু সেনগুপ্ত, সমর্থ কৃষণ লুথরা, এবং ধ্রুবজিৎ সাইকিয়া। তবে শীর্ষ আদালত এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়নি। বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেয়, ব্যক্তিগত বিষয়ে একজন বিচারকের উচিত সাধারণ নাগরিকের মতোই থানায় অভিযোগ দায়ের করা—নিজের পদমর্যাদা ব্যবহার করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা নয়। আদালত কোনও রকম স্বস্তি দিতে অস্বীকার করায় বিচারিক আধিকারিক শেষ পর্যন্ত নিজের আবেদন প্রত্যাহার করে নেন।

এই পর্যবেক্ষণ শুধু একটি নির্দিষ্ট মামলার রায় নয়, বরং বিচারব্যবস্থার নৈতিকতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ। শীর্ষ আদালতের বার্তা স্পষ্ট—বিচারপতির পদমর্যাদা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব মেটানোর হাতিয়ার হতে পারে না। আইনের চোখে সবাই সমান, বিচারকও তার ব্যতিক্রম নন।