আজকাল ওয়েবডেস্ক: তামিলনাড়ুর তিরুভাল্লুর জেলার পোথাত্তুরপেট্টাই গ্রামের একটি ছোট বাড়িতে ঘটে যাওয়া একটি “সাধারণ” সাপের কামড়ের মৃত্যু প্রথমে পুলিশের কাছেও নিছক দুর্ঘটনা বলেই মনে হয়েছিল। গ্রামীণ তামিলনাড়ুতে সাপের কামড়ে মৃত্যু নতুন কিছু নয়।
বন, ঝোপে ঘেরা এলাকা, দূরবর্তী হাসপাতাল, আর ভাগ্যের ওপর সব দোষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এই ধরনের ঘটনাকে দ্রুতই ফাইলবন্দি করে দেয়। কিন্তু এই মৃত্যুর কাগজপত্র যখন একটি বিমা সংস্থার হাতে পৌঁছাল, তখনই গল্পটা বদলে যেতে শুরু করে।
৫৬ বছরের ই.পি. গণেশন পোথাত্তুরপেট্টাইয়ের একটি সরকারি বালিকা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট গত ২২ অক্টোবর রাতে নিজের বাড়ির খাটে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন। তাঁর গলায় স্পষ্ট সাপের কামড়ের চিহ্ন। ছেলেরা, ২৯ বছরের মোহনরাজ ও ২৬ বছরের হরিহরণ, বাবাকে পোথাত্তুরপেট্টাই সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান এবং চিকিৎসকদের জানান, ঘুমের মধ্যে সাপে কেটেছে। হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
প্রথমে পুলিশ একটি ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ মামলা রুজু করে এবং ঘটনাটিকে দুর্ঘটনাজনিত সাপের কামড় বলেই ধরে নেয়। কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি ঘটনা।
গণেশনের পরিবারের তরফে একাধিক বিমার দাবি জানানো হলে সংশ্লিষ্ট বিমা সংস্থা নথিপত্র খতিয়ে দেখে সন্দেহ প্রকাশ করে। জানা যায়, তুলনামূলকভাবে কম আয়ের সরকারি কর্মচারী হয়েও গণেশনের নামে মোট ১১টি বিমা পলিসি ছিল, যার মোট কভারেজ প্রায় ৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে চারটি অত্যন্ত দামি পলিসি নেওয়া হয়েছিল মৃত্যুর মাত্র ছয় মাস আগে। পরিবারের আয়, ঋণ ও আর্থিক অবস্থার সঙ্গে এই বিপুল বিমার অঙ্ক অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় সংস্থার কর্তাদের।
বিমা সংস্থা বিষয়টি তুলে ধরে উত্তর তামিলনাড়ুর আইজি (নর্থ জোন) আসরা গার্গের দপ্তরের কাছে। এর পরেই ঘটনাটি নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেন তিরুভাল্লুরের পুলিশ সুপার বিবেকানন্দ শুক্লা।
৬ ডিসেম্বর একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন গুম্মিডিপুন্ডি সাব-ডিভিশনের ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট সি. জয়শ্রী। দলটি মোহনরাজ ও হরিহরণের কল ডিটেইলস, মোবাইল কথোপকথন এবং আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখে। তদন্তে উঠে আসে দু’ভাই গুরুতর আর্থিক চাপে ছিলেন, একাধিক ঋণ ছিল এবং মৃত্যুর ঠিক আগে ও পরে সন্দেহজনক অর্থ লেনদেন হয়েছে।
এর পাশাপাশি তদন্তকারীরা আরও একটি ভয়াবহ তথ্যের সন্ধান পান, গণেশন এর আগেও একবার সাপের কামড় থেকে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।
পুলিশের দাবি, হত্যার প্রথম চেষ্টা হয়েছিল মৃত্যুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে। সেই সময় মোহনরাজ ও হরিহরণ একটি কোবরা সাপ বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং ঘুমন্ত অবস্থায় বাবার পায়ে কামড় দেওয়ানো হয়। প্রতিবেশীরা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে গণেশন বেঁচে যান। কিন্তু তাতেও পরিকল্পনা থেকে সরে আসেননি ছেলেরা।
২২ অক্টোবর গভীর রাতে তারা আরও ভয়ংকর পরিকল্পনা করে। এবার আনা হয় অত্যন্ত বিষাক্ত একটি সাপ,পুলিশের মতে, রাসেল ভাইপার বা ক্রেইট। এই সাপ আনা হয় মানাভুর এলাকার বনাঞ্চল থেকে।
তদন্তে জানা যায়, মোহনরাজের এক প্রাক্তন সহকর্মী বালাজি (২৮) প্রথমে যোগাযোগ করেন মানাভুর গ্রামের প্রশান্ত (৩৫)-এর সঙ্গে। এরপর মুসুর গ্রামের সাপ ধরার লোক দিনাকরণ (৪৩)-কে আনা হয়। নবীনকুমার (২৮) পুরো আর্থিক লেনদেন ও সমন্বয়ের কাজ সামলান।
পুলিশ জানায়, সাপটিকে একটি বস্তায় করে গাড়িতে করে গণেশনের বাড়িতে আনা হয়। গভীর ঘুমের মধ্যে থাকা গণেশনের গলায় তিনবার সাপের কামড় দেওয়ানো হয় যেখানে বিষ দ্রুত রক্তে ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এক পুলিশ আধিকারিকের ভাষায়, “এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়। পরিকল্পিত, নিয়ন্ত্রিত এবং বারবার কামড় দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।”
মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর দিনাকরণ ঘরের মধ্যেই সাপটিকে মেরে ফেলে, যাতে প্রমাণ নষ্ট হয় এবং ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা বলেই মনে হয়। পুলিশের নজরে আসে, হাসপাতালে নিয়ে যেতে অস্বাভাবিক দেরিও করা হয়েছিল।
পুলিশের দাবি, এই পুরো ‘অপারেশন’-এর জন্য মোহনরাজ মোট ১.৫ লক্ষ টাকা দেন, এর মধ্যে ৯০ হাজার টাকা গুগল পে-র মাধ্যমে নবীনকুমারের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় এবং ৬০ হাজার টাকা নগদ দেওয়া হয়। পরে এই টাকা অভিযুক্তদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
বাবার মৃত্যুকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখিয়ে ছেলেরা বিমার টাকা দাবি করতে শুরু করেন। কিন্তু সেই দাবিই শেষ পর্যন্ত তাঁদের ফাঁসিয়ে দেয়।
মাত্র ১০ দিনের তদন্তের পর পুলিশ ছয়জনকেই গ্রেপ্তার করে, মোহনরাজ, হরিহরণ, বালাজি, প্রশান্ত, নবীনকুমার ও দিনাকরণ। একটি গাড়ি, একটি মোটরবাইক এবং একাধিক মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়। সকলকে আদালতে পেশ করে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত এখনও চলছে।
আইজি আসরা গার্গ জানিয়েছেন, “বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও মাঠপর্যায়ের তদন্ত মিলিয়েই এই জটিল মামলার রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে।” পুলিশ সুপার বিবেকানন্দ শুক্লা বলেন, “যা প্রথমে একেবারে সাধারণ গ্রামীণ দুর্ঘটনা বলে মনে হয়েছিল, সেটাই ছিল পরিকল্পিত খুন।”
তদন্তকারীদের মতে, এই হত্যাকাণ্ড এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে তা তিরুত্তানির মতো সাপপ্রবণ, ঝোপঝাড়ে ঘেরা এলাকায় প্রতিদিনের বিপদের পরিসংখ্যানের মধ্যেই হারিয়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিমার কাগজপত্রই প্রকাশ্যে এনে দেয় এক ভয়ংকর সত্য, বিমার টাকার লোভে নিজের বাবাকেই সাপের কামড়ে খুন করার অভিযোগ।
