আজকাল ওয়েবডেস্ক: দিল্লি পুলিশের সমস্ত বলপ্রয়োগ ও জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরেও লাদাখের সমাজকর্মী ও পরিবেশ আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুকের আমরণ অনশন এখনও অব্যাহত। আজ শনিবার (১৮ জুলাই) সকালে দিল্লির জান্তর মন্তরের ধর্নামঞ্চ থেকে সোনম ওয়াংচুককে একপ্রকার জোর জবরদস্তি তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। কিন্তু সফদরজং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি অনশন ভাঙছেন না এবং অবিলম্বে তাঁকে যন্তর মন্তরে ফিরে গিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক।

২১ দিনে পা দেওয়া এই অনশন আন্দোলনকে দমন করতে শনিবার ভোরেই অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে দিল্লি পুলিশ। সূত্রের খবর, সাদা পোশাকের পুলিশ কর্মীরা এসে আচমকাই ওয়াংচুককে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ধর্নাস্থলে উপস্থিত ছাত্র ও স্বেচ্ছাসেবকেরা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে পুলিশকে আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, পুলিশের বিপুল সংখ্যার সামনে তাঁরা পরাস্ত হন। পুলিশ চারদিক সাদা চাদর দিয়ে ঘিরে ফেলে ওয়াংচুককে গাড়িতে তোলে। সফদরজং হাসপাতালের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘ অনশনের কারণে সোনম ওয়াংচুক শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও ডিহাইড্রেটেড হয়ে পড়েছেন, তবে তাঁর অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল। এদিকে স্বামীর এই জোর করে  আটকের খবর পেয়েই হাসপাতালে পৌঁছান ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আঙমো। তিনি সমাজমাধ্যমে কড়া বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, তাঁর, পরিবারের কিংবা ওয়াংচুকের ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের লিখিত অনুমতি ছাড়া যেন কোনওভাবেই তাঁকে জোর করে তরল বা স্যালাইন না দেওয়া হয়।

এদিকে সোনম ওয়াংচুককে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরই উত্তাল হয়ে উঠেছে যন্তর মন্তর। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং দেশের সামগ্রিক পরীক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবিতে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইএএসএ)-র তিন ছাত্র প্রতিনিধি— নেহা, আমেন ও মণীশও টানা ২১ দিন ধরে অনশন চালাচ্ছেন। পুলিশ ওয়াংচুকের পর এই শিক্ষার্থীদেরও তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে অন্য ছাত্ররা তাঁদের রক্ষা করেন। অসুস্থ শরীরেই এক ভিডিও বার্তায় নেহা বলেন, "সরকার গত ২০ দিন ধরে আমাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি। আর আজ ২১ তম দিনে এসে গায়ের জোরে আমাদের আন্দোলনকে হসপিটালাইজড করার চেষ্টা করছে। এই দমনপীড়ন অত্যন্ত লজ্জাজনক।"

আন্দোলনের এই নাটকীয় মোড়ে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। শনিবার সকালেই পুলিশ তাঁকে গৃহবন্দী ও মারধর করে বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি যন্তর মন্তরে এসে সোনম ওয়াংচুকের সমর্থনে নিজেই আমরণ অনশনের ডাক দেন। ক্ষুব্ধ দিপকে সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একনায়ক বলে কটাক্ষ করেন এবং দিল্লি পুলিশকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। এই ঘটনার পর আন্দোলনের ঝাঁঝ আরও বাড়িয়ে আন্দোলনকারীরা শুধু শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান নয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবি করেছেন। যন্তর মন্তরে বক্তব্য রাখার সময় এক মহিলা আচমকাই দিপকে-র ওপর কালি ছুঁড়ে মারেন, যা নিয়ে সেখানে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায়।

দিল্লির নতুন পুলিশ কমিশনার হিসেবে অনুরাগ কুমার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক পরের দিনই পুলিশের এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে। যদিও পুলিশের দাবি, হাইকোর্টের নির্দেশ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনেই ওয়াংচুকের স্বাস্থ্যের অবনতির কথা মাথায় রেখে এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। তবে সফদরজং হাসপাতালের বাইরে যেভাবে রায়ট কন্ট্রোল বা দাঙ্গা দমনের গাড়ি মোতায়েন করা হয়েছে, তা দেখে স্পষ্ট যে প্রশাসন বেশ চড়ে রয়েছে। ২১ দিন ধরে দেশের রাজধানীর বুকে দেশের ভবিষ্যৎ ছাত্র সমাজ এবং একজন পদ্মশ্রী পদকপ্রাপ্ত (রমন ম্যাগসেসে জয়ী) ব্যক্তিত্ব অনশন করে চললেও, মোদি সরকারের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও  সদর্থক আলোচনা বা প্রতিক্রিয়া মেলেনি। সরকার এড়িয়ে গেলেও, আন্দোলনকারীরা কিন্তু এক চুল জমি ছাড়তেও নারাজ।