আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষী মুম্বই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন (MAHSR) প্রকল্প সময়মতো এগোতে না পারার জন্য সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় পক্ষকে দায়ী করেছেন জাপানের এক প্রাক্তন মন্ত্রী। তবে তাঁর এই বিস্ফোরক অভিযোগকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়ে ভারত স্পষ্ট জানিয়েছে, এটি ওই রাজনীতিবিদের একটি সম্পূর্ণ 'ব্যক্তিগত মতামত' এবং এর সাথে বাস্তব তথ্যের কোনও মিল নেই।
জাপানের ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা তথা দেশের প্রাক্তন আইনমন্ত্রী হিদেকি মাকিহারা সমাজমাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টে ভারতের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। এই বুলেট ট্রেন প্রকল্পের আলোচনার সাথে একসময় যুক্ত থাকা মাকিহারা দাবি করেন, আন্তর্জাতিক বৈঠক ও আলোচনার টেবিলে ভারতীয় প্রতিনিধিদের আচরণ ছিল চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন। তাঁর অভিযোগ, ভারতীয় পক্ষ বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কেবল নিজেদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে গেছে।
জাপানি কর্মীদের সম্মানের দোহাই দিয়ে তিনি লেখেন, এই প্রকল্প থমকে থাকার পেছনে ১০০ শতাংশ দায় ভারতের। জাপানের প্রাক্তন মন্ত্রীর এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার স্পষ্ট করে দেন যে, মুম্বই-আহমেদাবাদ হাই-স্পিড রেল প্রকল্প নিয়ে ভারত ও জাপানের মধ্যে আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে এগিয়ে চলেছে। তিনি জানান, এই প্রকল্পের জন্য জাপানের কাছ থেকে যে আধুনিক 'ই-টেন' (E10) বা 'ই-টুয়েন্টি' (E20) সিরিজের শিনকানসেন ট্রেন পাওয়ার কথা, তা এখনও গবেষণার স্তরে রয়েছে এবং ২০৩০-এর দশকের শুরুর আগে জাপানের পক্ষে তা সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
অথচ আগামী ২০২৭ সালের মধ্যেই এই প্রকল্পের প্রথম অংশ (সুরাট থেকে বিলিমোরা) চালু করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ফলে দেরি না করে নির্ধারিত সময়েই পরিষেবা চালু করতে ভারত ও জাপান—উভয় পক্ষই সহমত হয়ে আপাতত ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির হাই-স্পিড ট্রেন দিয়ে বুলেটের যাত্রা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বিতর্কের সূত্রপাত মূলত জাপানি রেল ইঞ্জিনিয়ার ইসাও সুজিমুরার একটি নিবন্ধকে কেন্দ্র করে, যা মাকিহারা তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেছিলেন।
সুজিমুরা দাবি করেছিলেন, ভারত প্রথমে জাপানি ট্রেনের চড়া দাম নিয়ে আপত্তি তোলে এবং পরবর্তীকালে বন্দে ভারতের সাফল্যের পর দেশীয় প্রযুক্তিতেই ট্রেন তৈরির পথে হাঁটে। এছাড়া সিগন্যালিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ভারত জাপানের প্রযুক্তির বদলে ইউরোপীয় প্রযুক্তি বেছে নিয়েছে। সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও ট্রেন পরস্পর অবিচ্ছেদ্য হওয়ায়, এই প্রকল্পে জাপানের বাদ পড়া এখন সময়ের অপেক্ষা এবং ভারতের এই প্রকল্প কার্যত 'মৃত' বলেও দাবি করেন তিনি।
এই প্রযুক্তির রদবদল প্রসঙ্গে ভারতের তরফ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই সিগন্যালিং সরঞ্জামের বরাত দেওয়া হয়েছে এবং এই বিষয়ে জাপানের পক্ষ থেকে কোনও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বা অফার দেওয়াই হয়নি। বিদেশ মন্ত্রক মনে করিয়ে দিয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব হাই-স্পিড রেল চালু করাই এখন দুই দেশের যৌথ লক্ষ্য। চলতি মাসেই জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দিল্লি সফরের সময়ও দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বুলেট ট্রেন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং ২০২৭ সালের মধ্যে প্রথম ভাগের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করার বিষয়ে জাপানের পূর্ণ সহযোগিতার কথা ফের জানিয়েছেন।
এই প্রকল্পের সিংহভাগ (৮১ শতাংশ) অর্থায়ন করছে জাপানি সংস্থা জাইকা (JICA)। ফলে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্র জাপানের একজন প্রাক্তন মন্ত্রীর এমন নজিরবিহীন আক্রমণকে নয়াদিল্লি যে বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ, তা বিদেশ মন্ত্রকের অনমনীয় জবাব থেকেই স্পষ্ট।
















