আজকাল ওয়েবডেস্ক: মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু সম্পর্ক আছে, যা রাজনৈতিক সীমানা, ধর্মীয় বিভাজন কিংবা সময়ের দূরত্ব—কিছুই ছিন্ন করতে পারেনি। ভারত ও ইরান—এই দুই প্রাচীন সভ্যতার সম্পর্ক ঠিক তেমনই এক বিস্ময়কর কাহিনি। একসময়ে তারা ছিল একই পরিবারের দুই ভাই, যারা হাজার হাজার বছর আগে ইউরেশীয় তৃণভূমি থেকে যাত্রা শুরু করে ভিন্ন পথে পা বাড়িয়েছিল—একজন দক্ষিণে, অন্যজন দক্ষিণ-পূর্বে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন হয়েও তারা বহন করে চলেছে এক অভিন্ন ঐতিহ্য—ভাষা, ধর্ম, দেবতা, আচার ও বিশ্বাসের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই সভ্যতার মূল শিকড় ‘ইন্দো-ইরানি’ বা ‘আর্য’ সংস্কৃতিতে নিহিত। আধুনিক ইরানের নামের উৎসও সেই ‘আর্য’ শব্দ—প্রাচীনকালে অঞ্চলটি পরিচিত ছিল ‘আর্যানাম’ বা ‘আর্যদের ভূমি’ হিসেবে। একইভাবে প্রাচীন ভারতের নাম ছিল ‘আর্যবর্ত’। ফলে এই দুই ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্ক যে কত গভীর, তা সহজেই অনুমেয়।

তবে আজকের দিনে ইরানকে যখন শুধুমাত্র একটি শিয়া মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়, তখন তার বহু সহস্রাব্দ পুরনো প্রাক-ইসলামিক ঐতিহ্য প্রায় আড়ালেই থেকে যায়। অথচ এই দেশেই এখনও জ্বলছে জরথুস্ত্রী ধর্মের পবিত্র আগুন, এবং বহু ইরানি নিজেদের ‘পারসিয়ান’ পরিচয়কে ধর্মীয় পরিচয়ের আগেও স্থান দেন। গবেষক শেরনাজ কামা, যিনি পারসি-জরথুস্ত্রী ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেন, মনে করেন—“ইন্দো-ইরানি পরিচয় মানবজাতির এক বৃহৎ পরিবারের অংশ, যা ভাষা, ইতিহাস, পুরাণ ও ধর্মের মাধ্যমে যুক্ত।”

ভাষাতত্ত্বের দিক থেকেও এই সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রোটো-ইরানীয় ও প্রোটো-ইন্দো-আর্য—এই দুই ভাষার শাখা এক অভিন্ন ‘ইন্দো-ইরানি’ ভাষা থেকে উদ্ভূত। ইরানে বিকশিত হয় আভেস্তান ও পার্সিয়ান ভাষা, আর ভারতে জন্ম নেয় সংস্কৃত। এই ভাষাগত ঐক্য শুধু শব্দের মিলেই নয়, ভাবনা ও দর্শনের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে মধ্য এশিয়ার কোথাও এক সংঘাত বা বিভেদের ফলে এই দুই গোষ্ঠীর বিচ্ছেদ ঘটে। তারপর একদল চলে আসে ইরান মালভূমিতে, অন্য দল ভারতীয় উপমহাদেশে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও তারা ধরে রাখে বহু অভিন্ন ঐতিহ্য।

&t=1s

এই মিলের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হল ‘অগ্নি উপাসনা’। জরথুস্ত্রী ধর্মে ‘ইয়াসনা’ এবং বৈদিক ধর্মে ‘যজ্ঞ’—এই দুই অগ্নি-অনুষ্ঠানের নামেই স্পষ্ট সাদৃশ্য দেখা যায়। পারসিদের অগ্নিমন্দির আজও সেই ঐতিহ্যের জীবন্ত নিদর্শন। শুধু আচার নয়, দেবদেবীর ক্ষেত্রেও রয়েছে বিস্ময়কর মিল। মিত্র, বায়ু, জলদেবতা আপাম নপাত কিংবা সোম/হোম—এই দেবতারা দুই সংস্কৃতিতেই পূজিত হয়েছেন। এমনকি ‘আহুরা মাজদা’—জরথুস্ত্রী ধর্মের সর্বোচ্চ দেবতা—এবং বৈদিক ‘অসুর’ শব্দের মধ্যে রয়েছে ভাষাগত যোগসূত্র। ঋগ্বেদে ‘অসুর’ একসময় দেবত্বের প্রতীক ছিল, যদিও পরে তার অর্থ নেতিবাচক হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞ মারিয়ানো এরিকিয়েলোর মতে, এই অর্থ বিকৃতি সম্ভবত এক ধর্মীয় সংস্কারের ফল, যা দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদের অন্যতম কারণ হতে পারে। প্রাচীন গ্রন্থগুলিও এই অভিন্ন অতীতের সাক্ষ্য দেয়। জরথুস্ত্রী ধর্মগ্রন্থ ‘আভেস্তা’ এবং বৈদিক ‘ঋগ্বেদ’-এ একই ধরনের নদী, ভূপ্রকৃতি ও স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন, ঋগ্বেদের সরস্বতী নদী আভেস্তায় ‘হারাক্স্বৈতি’ নামে পরিচিত, যা বর্তমান আফগানিস্তান-পাকিস্তান অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত। একইভাবে ‘হপ্ত হিন্দু’—আভেস্তায় উল্লিখিত একটি অঞ্চল—ঋগ্বেদের ‘সপ্ত সিন্ধু’র সঙ্গে মিলে যায়, যা সিন্ধু অববাহিকার প্রতীক।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই সভ্যতার পথ আলাদা হয়ে যায়। জরথুস্ত্রী ধর্মে অগ্নি রয়ে যায় পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে উপাসনার কেন্দ্রে, আর হিন্দু ধর্মে অগ্নি পায় আরও বিস্তৃত ভূমিকা—যজ্ঞ থেকে শুরু করে মৃতদেহের দাহ পর্যন্ত। তবুও উভয় ক্ষেত্রেই আগুনকে শুদ্ধতা ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক হিসেবেই দেখা হয়েছে—যেমন রামায়ণে সীতার অগ্নিপরীক্ষা। এই দীর্ঘ ইতিহাস যেন রবার্ট ফ্রস্টের সেই বিখ্যাত ‘দুটি পথের’ গল্পের মতো—একসময় একই পথ থেকে যাত্রা শুরু করেও তারা বেছে নিয়েছে ভিন্ন দিশা। কিন্তু হাজার বছরের ব্যবধানেও ভারত ও ইরানের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক আত্মীয়তা আজও অটুট, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ হিসেবেই থেকে যাবে।