আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০১৮ সালে এক যুগান্তকারী রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, পরকীয়া কোনো দণ্ডনীয় অপরাধ নয়। কোনো বিবাহিত নারী বা পুরুষ নিজের ইচ্ছায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ালে, তার জন্য আইনি শাস্তির মুখে পড়তে হবে না। এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘ আট বছর পর, পরকীয়া সংক্রান্ত মামলায় আবার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। শীর্ষ আদালতের পক্ষ থেকে এবার জানানো হলো, কোনো ব্যক্তি পরকীয়ায় লিপ্ত কি না, তা প্রমাণ করার জন্য কেবল তাঁর ফোনের কল রেকর্ড এবং হোটেলের বুকিংয়ের বিলই যথেষ্ট বলে গণ্য হতে পারে।

স্বামীর হোটেলের বুকিং রেকর্ড এবং কল ডিটেলস বা ফোনের কল রেকর্ড খতিয়ে দেখার জন্য দিল্লি হাইকোর্ট যে অনুমতি দিয়েছিল, তাতে হস্তক্ষেপ করতে রাজি হলো না দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মনমোহন এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ স্বামীর করা আপিলটি খারিজ করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ফ্যামিলি কোর্ট এবং দিল্লি হাইকোর্টের রায়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে গোপনীয়তা বজায় রাখতে এই সমস্ত নথিপত্র একটি সিলবন্ধ খামে ফ্যামিলি কোর্টে জমা দিতে হবে।

পুরো ঘটনাটির সূত্রপাত এক গৃহবধূর দায়ের করা বিবাহবিচ্ছেদের মামলাকে কেন্দ্র করে। স্বামীর বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতন ও পরকীয়া সম্পর্কের অভিযোগ এনেছিলেন ওই নারী। তাঁর দাবি ছিল, ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে জয়পুরের একটি বিলাসবহুল হোটেলে অন্য এক মহিলা সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্বামী। প্রাথমিকভাবে ওই স্ত্রী হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া শুরু হতে হতেই হোটেলের নিজস্ব নিয়ম মেনে সেই ফুটেজ মুছে ফেলা হয়।

এর পরেই হাল না ছেড়ে ফ্যামিলি কোর্টের দ্বারস্থ হন ওই মহিলা। তিনি স্বামীর হোটেলের বুকিং হিস্ট্রি, ওই ঘরে কে কে ছিলেন তাঁদের পরিচয়পত্র, টাকা মেটানোর রসিদ এবং নির্দিষ্ট ওই সময়ের স্বামীর ফোনের কল রেকর্ড তলব করার আবেদন জানান। ফ্যামিলি কোর্ট সেই আর্জি মঞ্জুর করে সিলবন্ধ খামে নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ফ্যামিলি কোর্টের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টে যান স্বামী। তাঁর প্রধান যুক্তি ছিল, এভাবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত তথ্য সামনে আনা হলে তাঁর সংবিধানে দেওয়া ‘গোপনীয়তার মৌলিক অধিকার’ বা রাইট টু প্রাইভেসি লঙ্ঘিত হবে।

কিন্তু হাইকোর্ট স্বামীর সেই যুক্তি খারিজ করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, স্ত্রী কেবল এমন কিছু তথ্যপ্রমাণ জোগাড়ের চেষ্টা করছেন যা দিয়ে তিনি পরকীয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেন। আর এই ধরনের সম্পর্কের প্রমাণ সরাসরি পাওয়া কঠিন, পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই আদালতকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। হাইকোর্ট সাফ জানায়, বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় কোনও  পক্ষ যদি পরকীয়ার অভিযোগ প্রমাণের জন্য উপযুক্ত তথ্য চায়, তবে আদালতের সেখানে এগিয়ে আসা উচিত। পারিবারিক আদালতের এই বিষয়ে বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে।

এবার সুপ্রিম কোর্টও হাইকোর্টের সেই রায়ে সিলমোহর দিল। সর্বোচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, বৈবাহিক বিবাদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত সুরক্ষাকবচ (যেমন সিলবন্ধ খাম) ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ জোগাড়ে সায় দিতে পারে আদালত।

প্রসঙ্গত, গত বছরও এই সংক্রান্ত একটি তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার বেঞ্চ জানিয়েছিল, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গোপনে রেকর্ড করা কথোপকথনও বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় প্রমাণ হিসেবে আদালতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। ভারতীয় সাক্ষ্য আইনের ধারা ১২২-এর অধীনে বৈবাহিক কথোপকথন গোপন রাখার যে আইনি সুরক্ষা রয়েছে, তা থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের রেকর্ডিংকে প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য করা যাবে বলে জানিয়েছিল শীর্ষ আদালত। এবার হোটেলের রেকর্ড ও কল ডিটেলস পাওয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই অবস্থান পরকীয়ার মামলা লড়ার ক্ষেত্রে মহিলাদের আইনি লড়াইকে আরও কিছুটা সহজ করল বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।