আবু হায়াত বিশ্বাস: প্রায় চার দশক পর লোকসভায় স্পিকার অপসারণের প্রস্তাব নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতের সাক্ষী থাকল সংসদ। বিরোধী দলগুলির আনা অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে মঙ্গলবার লোকসভায় আলোচনা শুরু হলে স্পিকার ওম বিড়লার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিরোধী শিবির।

সংখ্যার নিরিখে প্রস্তাবটি পাশ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ হলেও, বিরোধীরা এই বিতর্ককে সংসদের ভেতরে নিজেদের অভিযোগ নথিভুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে। প্রস্তাবটি লোকসভায় উত্থাপন করেন কংগ্রেস সাংসদ মহম্মদ জাবেদ। তাঁর অভিযোগ, স্পিকার হিসেবে সংসদের সব পক্ষের আস্থা অর্জনের জন্য যে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা প্রয়োজন, তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন ওম বিড়লা। তিনি বলেন, স্পিকার যদি নিরপেক্ষ না থাকেন, তাহলে সংসদের গণতান্ত্রিক কার্যপ্রণালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিতর্কে অংশ নিয়ে কংগ্রেসের লোকসভার উপনেতা গৌরব গগৈ তীব্র আক্রমণ শানান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘‌স্পিকার সরকারের কণ্ঠস্বর নন; তাঁর কাজ সংসদের মর্যাদা এবং নিরপেক্ষতা রক্ষা করা।’‌ গগৈ জানান, এই প্রস্তাব ব্যক্তিগতভাবে ওম বিড়লাকে লক্ষ্য করে আনা হয়নি, বরং লোকসভার মর্যাদা রক্ষার স্বার্থেই বিরোধীরা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। গগৈ আরও অভিযোগ করেন, স্পিকার নিজেই প্যানেলের চেয়ারপার্সনদের নিয়োগ করেছেন এবং সেই প্যানেলের সদস্য বিজেপি সাংসদ জগদম্বিকা পাল কীভাবে স্পিকারের বিরুদ্ধে আনা প্রস্তাবের বিতর্ক পরিচালনা করতে পারেন?‌ প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, অতীতে সংসদের ইতিহাসে এমন নজির খুব কমই দেখা গেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, লোকসভায় বহু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। গগৈ বলেন, সংসদের অসংশোধিত কার্যবিবরণী খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, একাধিকবার বিরোধী দলনেতা বক্তব্য রাখতে উঠলেও অন্য সদস্যদের নাম ডেকে তাঁকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাইক বন্ধ করে সাংসদদের চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের আচরণ সংসদীয় রীতিনীতির পরিপন্থী, মন্তব্য করেন গগৈ।

এদিকে একই বিতর্কে অংশ নিয়ে কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর পক্ষে সরব হন। সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, গত বারো বছরে রাহুল গান্ধীই একমাত্র নেতা যিনি সরকারের সামনে মাথা নত করেননি এবং নির্ভয়ে সত্য কথা বলেছেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে এই মন্তব্য করেন। রিজিজু তাঁর বক্তৃতায় ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর একটি পুরনো বক্তব্য উদ্ধৃত করেন, যেখানে ১৯৫৪ সালে তৎকালীন লোকসভা স্পিকার জিভি মভলঙ্কের বিরুদ্ধে আনা অপসারণ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন নেহরু।

এই প্রসঙ্গে কটাক্ষ করে প্রিয়াঙ্কা বলেন,‘‌আমি হাসছিলাম, কারণ যাকে তারা দিনরাত সমালোচনা করে—সেই নেহরুজির বক্তব্যই আজ নিজেদের যুক্তির পক্ষে ব্যবহার করছে। হঠাৎ করেই তারা নেহরুজির প্রতি সম্মান দেখাতে শুরু করেছে।’‌ তিনি আরও বলেন, ‘‌গত বারো বছরে একজনই আছেন যিনি এই সরকারের সামনে কখনও মাথা নত করেননি—তিনি হলেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তিনি সংসদে নির্ভয়ে সত্য কথা বলেন, আর সেই সত্যই সরকার সহ্য করতে পারে না।’‌ অন্যদিকে, বক্তব্যের সময় কিরেন রিজিজু হালকা রসিকতার সুরে বলেন, যদি প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে বিরোধী দলনেতা করা হত, তাহলে কংগ্রেসের পারফরম্যান্স আরও ভালো হতে পারত।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে শাসক জোট এনডিএ-র কাছে এই প্রস্তাব কার্যত প্রতীকী বলেই মনে করা হচ্ছে। তবু দীর্ঘদিন পর লোকসভায় স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে এমন সরব বিতর্ক সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। বিরোধীরা এই বিতর্কের মাধ্যমে সংসদের কার্যপ্রণালী, স্পিকারের ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির মর্যাদা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরতে চাই। জানা গিয়েছে, কাল বুধবার অনাস্থা প্রস্তাবের বিরোধীতা করে সরকারের তরফে জবাব দেবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এই বিতর্কের জন্য ১০ ঘণ্টা বরাদ্দ হয়েছে।