আজকাল ওয়েবডেস্ক: নতুন শ্রম কোডগুলি ভারতের শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে—এমন আশঙ্কা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ২০১৯ সালে সংসদে মজুরি কোড পাশ হওয়ার পর ২০২০ সালে আরও তিনটি আইন—ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস কোড, সোশ্যাল সিকিউরিটি কোড এবং অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড ওয়ার্কিং কন্ডিশনস কোড—পাস হয়। ব্যবসায়ী মহল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে পুরনো শ্রম আইন বহুস্তরীয়, জটিল এবং ‘ব্যবসাবান্ধব’ নয়, তাই দ্রুত নতুন কোডগুলি কার্যকর করা প্রয়োজন। বিপরীতে শ্রমিক সংগঠনগুলি প্রথম থেকেই এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছে, কারণ তাঁদের মতে নতুন আইন শ্রমিকদের অধিকার সংকোচনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিচ্ছে।
সংবাদ পোর্টাল দ্যা ওয়্যার-এর একটি প্রবন্ধ অনুসারে, সরকার দাবি করছে, বহু পুরোনো ও জটিল আইনকে একত্রিত করে সরলীকরণ করা হয়েছে। কিন্তু সরলীকরণ শুধুই প্রযুক্তিগত শব্দ নয়—তার বাস্তব রূপ নির্ভর করে আইন কীভাবে গঠিত, প্রয়োগ কীভাবে হবে এবং তার উদ্দেশ্য শ্রমিক নাকি ব্যবসার সুবিধা নিশ্চিত করা। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা যেমন জিএসটি’র ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সেখানে সরলীকরণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে আরও জটিলতা, মামলা এবং ছোট উদ্যোগ ও অনিয়ন্ত্রিত খাতে বিপর্যয় তৈরি করেছে। শ্রম আইন ক্ষেত্রেও একই আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
শ্রম আইন জটিল হওয়ার কারণ শ্রম নয়, বরং বছরের পর বছর ব্যবসা ও মালিকপক্ষ আইনের ফাঁক গলে অতিরিক্ত লাভ তোলার চেষ্টা করেছে। আইন না মানাকে একটি পদ্ধতিগত চর্চায় পরিণত করা হয়েছে। ফলে যেসব অংশ শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ পায়নি। এই প্রেক্ষাপটে নতুন কোডগুলি কার্যকর হলেও প্রশ্ন থাকছে—শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে তা আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি?
দ্যা ওয়্যার-এর প্রবন্ধের মতে, ভারতের শ্রমিক শ্রেণীর শক্তিহীনতা এই সমস্যার মূল কারণ। নীতিনির্ধারক, প্রশাসনিক মহল এবং ব্যবসায়ী স্বার্থ এক সুস্পষ্ট ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে শ্রমিক অধিকারের প্রশ্নটি সবসময়েই উপেক্ষিত। ১৯৯১-এর উদারনীতি নীতি গ্রহণের পর থেকেই শ্রম আইনকে ‘বিনিয়োগবিরোধী’ বলে দুর্বল করার প্রয়াস শুরু হয় এবং ২০১৪ সালের পর তা আরও দ্রুততর হয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ঘোষিত আত্মনির্ভর ভারত প্যাকেজও শ্রমিকদের বিপর্যস্ত পরিস্থিতির তুলনায় কর্পোরেটদের বেশি স্বস্তি দিয়েছে।
নতুন শ্রম কোড অনুযায়ী কাজের সময় বৃদ্ধি পাবে, সংগঠিত খাতের শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকার সীমিত হবে এবং চাকরির নিরাপত্তা বড় অংশে নিয়োগকর্তার ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে। এর ফলে সংগঠিত খাতের শ্রমিকরাও ক্রমশ অসংগঠিত খাতের মতো অনিরাপদ ও অধিকারবিহীন অবস্থায় পৌঁছে যাবে। বর্তমানে দেশের ৯৪ শতাংশ শ্রমিক অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত, এবং সরকারী তথ্যপ্রকাশে দেখা গেছে, ই-শ্রম পোর্টালে নথিভুক্ত শ্রমিকদের ৯০ শতাংশই জানিয়েছেন তাঁদের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকার নিচে—প্রায় দারিদ্র্যসীমার সমান। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং অটোমেশন শ্রমবাজারে নিরাপত্তাহীনতাকে আরও গভীর করছে।
ব্যবসায়ী মহলের দাবি, পুরনো শ্রম আইন বিনিয়োগে বাধা দিত। কিন্তু তথ্য বলছে অন্য কথা—২০০৩ থেকে ২০০৯ সালে যখন সর্বোচ্চ হারে শিল্প বিনিয়োগ ও বৃদ্ধির হার দেখা গিয়েছিল, তখনই সেই পুরনো আইন কার্যকর ছিল। আজ কর্পোরেট কর কমিয়েও বিনিয়োগ বাড়েনি। তার প্রধান কারণ শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং দেশে সামগ্রিক চাহিদার ঘাটতি। নতুন শ্রম কোড প্রয়োগ হলে শ্রমিকদের আয় ও চাকরির মান আরও কমবে, ফলে চাহিদা কমবে এবং বিনিয়োগ অনিশ্চিতই থাকবে।
সরকার দাবি করছে, মহিলা শ্রমিক ও গিগ-ওয়ার্কারের জন্য সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—অধিকার ছেঁটে নিয়ে অল্প সুবিধা দেওয়াকে কি সত্যিই অগ্রগতি বলা যায়? কাজের সময় বৃদ্ধি, আংশিক বা অস্থায়ী চাকরির প্রসার এবং ইউনিয়ন ভেঙে দেওয়া—এসব সামাজিক বৈষম্যকে আরও গভীর করবে।
শিল্পপতি হেনরি ফোর্ড এক শতাব্দী আগে বলেছিলেন—“আমার শ্রমিকরা যদি আমার গাড়ি কিনতে না পারে, তবে আমি তা কেন তৈরি করব?” ভারতের শ্রমবাজারে সেই যুক্তিরই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে, বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখতে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী করতে শ্রমিকের আয় বৃদ্ধি অপরিহার্য। কিন্তু নতুন শ্রম কোড ঠিক বিপরীত পথে হাঁটছে—ব্যবসায়ী স্বার্থ রক্ষায় শ্রমিক সুরক্ষা দুর্বল করে।
প্রশ্ন এখন একটাই—এটাই কি ভারতের ভবিষ্যৎ শ্রমনীতি? শ্রমিককে অদৃশ্য করে রেখে, তার মৌলিক অধিকার দুর্বল করে শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে অর্থনৈতিক অগ্রগতি আদৌ সম্ভব?
