আজকাল ওয়েবডেস্ক: উত্তরবঙ্গে নবম আন্তর্জাতিক সাঁওতাল সম্মেলনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতি এবং আয়োজন সংক্রান্ত তাঁর অসন্তোষের পর এবার সরাসরি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তবে পাল্টা ব্যাখ্যা দিয়ে রাজ্য প্রশাসন জানিয়েছে, প্রোটোকল ভাঙার কোনও প্রশ্নই ওঠে না এবং অনুষ্ঠানটি ছিল একটি বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগ।

শনিবার শিলিগুড়ির কাছে অনুষ্ঠিত নবম আন্তর্জাতিক আদিবাসী সাঁওতাল সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু আয়োজন নিয়ে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানটি আরও বড় জায়গায় হলে ভালো হত, যাতে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের আরও বেশি মানুষ উপস্থিত থাকতে পারতেন। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতির কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, হয়তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপর রাগ করেছেন বলেই আসেননি।

রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে এই ঘটনাকে “লজ্জাজনক এবং অভূতপূর্ব” বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “গণতন্ত্র এবং জনজাতি সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী মানুষজন এই ঘটনায় ব্যথিত। রাষ্ট্রপতি নিজেও জনজাতি সম্প্রদায় থেকে উঠে এসেছেন। তাঁর প্রকাশিত বেদনা গোটা দেশের মানুষের মনে গভীর দুঃখের সৃষ্টি করেছে।”

প্রধানমন্ত্রী সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে দায়ী করে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছে। রাষ্ট্রপতির প্রতি এই অসম্মানের জন্য রাজ্য প্রশাসনই দায়ী।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাঁওতাল সংস্কৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও রাজ্য সরকার যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং এই পদের মর্যাদা সর্বদা রক্ষা করা উচিত।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও একই সুরে রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল সরকারের আচরণ রাষ্ট্রপতির প্রতি অসম্মানজনক এবং তা দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকেও অপমান করার সামিল। অমিত শাহ বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার তাদের নৈরাজ্যপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে আবারও নিচে নেমে গেল। প্রোটোকলের প্রতি চরম অবহেলা দেখিয়ে তারা ভারতের রাষ্ট্রপতিকে অপমান করেছে।” এই ঘটনাকে তিনি তৃণমূল সরকারের ‘নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন’ বলেও উল্লেখ করেন।

তবে এই অভিযোগের মধ্যেই পাল্টা ব্যাখ্যা দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন। রাজ্য সরকারের সূত্রে জানানো হয়েছে, যে অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি যোগ দিয়েছিলেন সেটি কোনও সরকারি অনুষ্ঠান ছিল না। ‘ইন্টারন্যাশনাল সান্তাল কাউন্সিল’ নামে একটি বেসরকারি সংগঠন ওই সম্মেলনের আয়োজন করেছিল এবং তাদের আমন্ত্রণেই রাষ্ট্রপতি সেখানে গিয়েছিলেন।

প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, ‘অ্যাডভান্সড সিকিউরিটি লিয়াজো’ বৈঠকের সময়ই দার্জিলিং জেলা প্রশাসন লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়কে জানিয়েছিল যে আয়োজকদের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় বলে মনে হচ্ছে। এই উদ্বেগ টেলিফোনেও জানানো হয়েছিল বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অগ্রিম দল ৫ মার্চ অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শন করে এবং সেখানেও আয়োজনের ঘাটতির বিষয়টি তাদের জানানো হয়। তবুও রাষ্ট্রপতির সফরসূচি অপরিবর্তিত রাখা হয়।

রাজ্য প্রশাসনের দাবি, রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানানো এবং বিদায় জানানোর ক্ষেত্রে সমস্ত সরকারি প্রোটোকল কঠোরভাবে মেনে চলা হয়েছে। শিলিগুড়ি পুরনিগমের মেয়র, দার্জিলিংয়ের জেলাশাসক এবং শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান এবং বিদায়ও জানান। এই তালিকাটি রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অনুমোদিত ‘লাইন-আপ’ অনুযায়ীই নির্ধারিত ছিল।

প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই কর্মসূচির মঞ্চ বা স্বাগত তালিকায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ছিল না। ফলে প্রোটোকল ভাঙার অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই বলেই দাবি করা হয়েছে।

এই বিতর্কের মধ্যেই ধর্মতলায় চলা ধর্নামঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতিকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্মান করেন, কিন্তু তাঁকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “মাননীয় রাষ্ট্রপতিকে আমরা যথেষ্ট সম্মান করি। কিন্তু তাঁকে দিয়েও রাজনীতি করানো হচ্ছে। বিজেপির এজেন্ডা নিয়ে তাঁকে পাঠানো হয়েছে।”

সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতির সফর, আয়োজন ঘিরে অসন্তোষ এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিতর্ক আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।