আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে ভারত জুড়ে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের সঙ্কট।‌ ধুঁকছে বিভিন্ন শহরের রেস্তোরাঁ। ইতিমধ্যেই একের পর এক রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। এবার সেই ধাক্কা পড়ল দিল্লি হাইকোর্টেও। দিল্লি হাইকোর্টের ক্যান্টিনেও নিত্যদিনের মেনুতে কাটছাঁট করা হল। 

সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দিল্লি হাইকোর্টের ক্যান্টিনে ঢুকেই আইনজীবীদের মুখ ফ্যাকাশে। কারণ? এলপিজি সঙ্কটের জেরে গরম গরম সুস্বাদু খাবার আর পাওয়া যাচ্ছে না। এলপিজি সঙ্কটের জেরেই দিল্লি হাইকোর্টের ক্যান্টিনের মেনু থেকে বাদ পড়েছে একাধিক খাবারের পদ। সাধারণ কিছু মুখরোচক খাবার যদিও পাওয়া যাচ্ছে। 

জানা গেছে, এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের সঙ্কটের জেরে দিল্লি হাইকোর্টের ক্যান্টিনে বিরিয়ানি, ডাল মাখানি, শাহি পনিরের মতো লোভনীয় পদ এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। শুধুমাত্র পাওয়া যাচ্ছে স্যান্ডউইচ, স্যালাডের মতো সাধারণ কিছু খাবার। আইনজীবীদের ক্যান্টিনে একটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। 

নোটিশে বলা হয়েছে, 'আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানানো হচ্ছে, এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের সঙ্কটের জেরে বর্তমানে মেইন কোর্স রান্না করা এবং পরিবেশন করা হচ্ছে না আইনজীবীদের ক্যান্টিনে।' ক্যান্টিনের মালিক জানিয়েছেন, সঙ্কট না কাটা পর্যন্ত মেইন কোর্স রান্না করা সম্ভব নয়। এই সঙ্কট কবে কাটবে, তা নিয়েও ধারণা নেই তাঁদের। 

এই সময়কালে দিল্লি হাইকোর্টের ক্যান্টিনে পাওয়া যাবে স্যান্ডউইচ, স্যালাড, ফ্রুট চার্টের মতো হালকা খাবার। যা বানানোর জন্য গ্যাস সিলিন্ডারের প্রয়োজন নেই। 

যুদ্ধক্ষেত্র প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার দূরে হলেও তার ধাক্কা পৌঁছে গিয়েছে দেশের রান্নাঘরে। বিশেষ করে মুম্বই, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের বহু হোটেল ও রেস্তোরাঁ গ্যাসের পড়েছে সঙ্কটে। 

এই সমস্যার মূল কারণ হল পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ এই প্রণালীটি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই পথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। তার ফলে এলপিজি সরবরাহে তৈরি হয়েছে সমস্যা। ভারতে রান্নার গ্যাসের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ এলপিজি আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ গ্যাস হরমুজ প্রণালী হয়ে দেশে আসে। 

দেশে বছরে প্রায় ৩১ মিলিয়ন টন এলপিজি ব্যবহার হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ ব্যবহার করে সাধারণ পরিবার। বাকি অংশ ব্যবহার করে হোটেল ও রেস্তোরাঁ। যুদ্ধের কারণে বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে হোটেল ও রেস্তোরাঁ। 

অনেক রেস্তোরাঁয় বিকল্প ব্যবস্থা নেই। পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ বা বড় মাপের বৈদ্যুতিক রান্নার ব্যবস্থা অধিকাংশ জায়গায় নেই। ফলে প্রতিদিনের রান্নার জন্য তারা সম্পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক এলপিজির উপর নির্ভরশীল। এর ফলে শুধু বড় শহর নয়, পুনে ও পুদুচেরির মতো জায়গাতেও প্রভাব পড়ছে। 

সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা দিয়েছে মুম্বই শহরে। হোটেল সংগঠন এএইচএআর জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই প্রায় ২০ শতাংশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দ্রুত না বদলালে আগামী দু’দিনের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ হোটেল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। 

দাদার ও আন্ধেরির মতো জনপ্রিয় এলাকায় অনেক রেস্তোরাঁ ইতিমধ্যেই মেনু ছোট করে ফেলেছে। অনেক জায়গায় দোকান খোলার সময়ও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, যতটা সম্ভব গ্যাস বাঁচিয়ে রাখা। 

এদিকে ব্যাঙ্গালুরু শহরেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বেঙ্গালুরু হোটেলস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ১০ মার্চ থেকে শহরের বহু হোটেলের কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শহরের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ বিদ্যার্থী ভবন–এর মালিক জানিয়েছেন, “মাত্র পাঁচটি গ্যাস সিলিন্ডার বাকি রয়েছে। এই গ্যাস সম্ভবত আর একদিনের বেশি চলবে না। গ্যাস বাঁচানোর জন্য ইতিমধ্যেই দুটি তাওয়া ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছি। এরপর গ্যাস না পেলে রেস্তোরাঁ বন্ধ করতে হবে।” 

একই সমস্যা দেখা দিয়েছে চেন্নাই শহরেও। চেন্নাই হোটেল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, অনেক ডিস্ট্রিবিউটর বলছেন তাদের কাছে গ্যাসের মজুত নেই। ফলে বহু রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। 

এই পরিস্থিতির পিছনে আরেকটি কারণ রয়েছে। এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে, কেন্দ্রীয় সরকার ঘরোয়া গ্যাসের সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর ফলে সাধারণ পরিবারের জন্য রান্নার গ্যাস-সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। 

সরকার জানিয়েছে, দেশে গ্যাসের কোনও ঘাটতি নেই। তবু পরিস্থিতি সামাল দিতে রিফাইনারিগুলিকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও গ্যাস বুকিংয়ের সময়সীমা ২১ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে। যাতে মজুত করে রাখার প্রবণতা কমে। গ্যাসের দামও বেড়েছে। দিল্লিতে একটি ঘরোয়া এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে হয়েছে ৯১৩ টাকা। বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দামও ১১৪.৫ টাকা বেড়েছে।

তবে রেস্তোরাঁ শিল্পের সংগঠন ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি কঠিন। তাদের দাবি, কাগজে সরবরাহ বন্ধ না হলেও অনেক ডিস্ট্রিবিউটর গ্যাস দিতে পারছেন না। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত না বদলালে দেশের বহু শহরে রেস্তোরাঁ বড় সঙ্কটে পড়তে পারে। এমনকী সাধারণ মানুষের প্রিয় খাবারও সাময়িক ভাবে মেনু থেকে হারিয়ে যেতে পারে।