আজকাল ওয়েবডেস্ক: ওড়িশার পবিত্র তীর্থক্ষেত্র পুরীর মাটির নিচে কি লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন শহর? এই প্রশ্নটি এখন কেবল জল্পনা নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক সত্যের দিকে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি অত্যন্ত আধুনিক ‘গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার’ (GPR) সমীক্ষায় উঠে আসা তথ্য এখন প্রত্নতাত্ত্বিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। আইআইটি গান্ধীনগরের (IIT Gandhinagar) বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত এই গবেষণায় শ্রী জগন্নাথ মন্দিরের নিচে এবং তার আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাচীন বসতি, স্থাপত্য এবং এমনকি একটি রহস্যময় সুড়ঙ্গের অস্তিত্বের জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এই ঐতিহাসিক রহস্যের সূত্রপাত হয়েছিল ‘শ্রীমন্দির পরিক্রমা প্রকল্প’-এর প্রাথমিক খননকার্যের সময়। সেই সময় মাটির গভীরে গঙ্গা রাজবংশের আমলের প্রাচীন সিংহমূর্তি ও প্রায় ৩০ ফুট লম্বা একটি বিশাল দেওয়াল উদ্ধার হয়। এই আবিষ্কারের পর যখন চারদিকে হইচই পড়ে যায়, তখন শ্রী জগন্নাথ মন্দির প্রশাসন ও ওড়িশা ব্রিজ অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন (OBCC) প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রাডার সমীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ২১.৬ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে এক প্রাচীন স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ। এমোর মঠ, নৃসিংহ মন্দির এবং বুড়ি মা মন্দিরের আশপাশে এমন ৪৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হেরিটেজ সাইট বা ঐতিহ্যবাহী স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, যা কয়েকশ বছর ধরে মাটির নিচে লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল।

সবচেয়ে বড় চমক হলো একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের হদিস। গবেষকদের দাবি, জগন্নাথ মন্দিরের প্রধান চত্বর থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত একটি গোপন পথ বা সুড়ঙ্গ থাকার সম্ভাবনা প্রবল। এছাড়া মাটির নিচে ৭.৬ মিটার বাই ৩ মিটার আয়তনের একটি বিশেষ কক্ষ বা চেম্বারের অস্তিত্বও ধরা পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এখানে একসময় অত্যন্ত মূল্যবান স্বর্ণমূর্তি বা দেববিগ্রহ রেখে গোপনে পূজা করা হতো। শুধু স্থাপত্য নয়, মাটির স্তরে স্তরে পাওয়া গেছে প্রাচীন মৃৎপাত্র, ধাতব বস্তু এবং মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য বিচিত্র জিনিসের অবশিষ্টাংশ, যা প্রমাণ করে যে কয়েকশ বছর আগে এখানে এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও আধুনিক জনবসতি গড়ে উঠেছিল।

তবে এই চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার ঘিরে বিতর্কের ছায়াও দেখা দিয়েছে। এর আগে হেরিটেজ করিডোর প্রকল্পের খননের সময় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে গঙ্গা রাজবংশের দুটি বহুমূল্য সিংহমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা নিয়ে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সেই সময় কোনও  বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়াই খননকাজ চালানোয় প্রত্নতত্ত্ববিদরা তীব্র সমালোচনা করেন। বর্তমানে আইআইটি-র এই রিপোর্টটি নিয়ে মন্দির প্রশাসন ও সরকারি স্তরে কিছুটা গোপনীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করা হলেও, অ্যাডভোকেট দিলীপ বড়াল আরটিআই (RTI)-এর মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের প্রতিলিপি প্রকাশ্যে এনেছেন। ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতত্ত্ববিদরা এখন একসুরে দাবি তুলছেন যে, পুরীর এই ‘লুকানো ঐতিহ্য’ বা চাপা পড়া শহরটি রক্ষায় অবিলম্বে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক খননকার্য ও সংরক্ষণ শুরু করা উচিত, যাতে ভারতের ইতিহাসের এই অমূল্য সম্পদ চিরতরে হারিয়ে না যায়।