আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতীয় স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো নিয়ে এক বিস্ফোরক রিপোর্ট পেশ করল নীতি আয়োগ। ‘স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক দশ বছরের এক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশে প্রাথমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় থাকলেও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। নীতি আয়োগের ভাষায়, ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে একটি ‘খাড়া পিরামিড’-এর মতো দাঁড়িয়ে আছে, যার ভিত্তি মজবুত হলেও শীর্ষ অত্যন্ত সংকীর্ণ।
রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪.৭১ লক্ষ স্কুল এবং ২৪.৬৯ কোটি পড়ুয়া রয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। দেশে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা যেখানে ৭.৩ লক্ষ, সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা মাত্র ১.৬৪ লক্ষ। এই বিশাল ফারাক পড়ুয়াদের মাঝপথে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য করছে। তথ্য বলছে, প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৪ জনই উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার আগেই স্কুলছুট হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির জন্য স্কুলের পরিকাঠামোগত বিচ্ছিন্নতাকেই দায়ী করেছে নীতি আয়োগ। দেশের মাত্র ৫.৪ শতাংশ স্কুলে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। বাকি পড়ুয়াদের প্রতি পদে স্কুল বদল করতে হয়, যা ছাত্রছাত্রীদের ড্রপ আউট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। নির্দিষ্ট লিঙ্কেজ বা যোগসূত্র না থাকায় অনেক সময় স্থানীয় স্তরে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল খুঁজে পায় না গ্রামগঞ্জের পড়ুয়ারা।
রিপোর্টের আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য হল ‘শূন্য পড়ুয়া’র স্কুল। সারা দেশে ৭,৯৯৩টি স্কুলে বর্তমানে একজনও পড়ুয়া নেই। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। রাজ্যে ৩,৮১২টি স্কুলে কোনও ছাত্রছাত্রী নেই, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর পরেই রয়েছে তেলঙ্গানা (২,২৪৫)। প্রশাসনিক খাতায় এই স্কুলগুলো ‘চলছে’ দেখালেও বাস্তবে সেখানে কোনও পঠনপাঠন হয় না। অথচ নথিবদ্ধ রেকর্ড আপডেট না হওয়ায় এই স্কুলগুলোর জন্য নিয়মিত সরকারি অর্থ ও মানবসম্পদ বরাদ্দ হয়ে চলেছে।
কেবল স্কুলছুট নয়, শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নীতি আয়োগ। দেখা যাচ্ছে, গত দশ বছরে অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়াদের পড়ার দক্ষতা (Reading Proficiency) কমেছে। ২০১৪ সালে অষ্টম শ্রেণির প্রায় ৭৪.৭ শতাংশ পড়ুয়া দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্য অনায়াসে পড়তে পারত। ২০২৪ সালে সেই হার কমে দাঁড়িয়েছে ৭১.১ শতাংশে। অর্থাৎ স্কুলে ভর্তির হার বাড়লেও প্রকৃত মেধা বা শিখন পদ্ধতিতে বড়সড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে।
নীতি আয়োগের এই রিপোর্ট স্পষ্ট করে দিল যে, কেবল নতুন স্কুল তৈরি নয়, বরং শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ না করলে ভারতের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক গভীর সংকটের মুখে পড়বে।















