আজকাল ওয়েবডেস্ক: চেন্নাইয়ের জওহরলাল নেহরু ইনডোর স্টেডিয়ামের বাইরে তখন গনগনে রোদ। বিশাল সব কাটআউটের নিচে অপেক্ষায় হাজার হাজার মানুষ। হঠাৎ যখন সাদা শার্ট আর কালো ট্রাউজার্স পরা এক ব্যক্তি গাড়ি থেকে নামলেন, তখন ভিড়ের উন্মাদনা দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি কি কোনও ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন নাকি নিজের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে! দীর্ঘ কয়েক দশকের দ্রাবিড় রাজনীতির প্রথা ভেঙে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সি জোসেফ বিজয়ের এই আবির্ভাব কেবল একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নয়, বরং তামিল রাজনীতির এক ‘সাজপোশাকের বিপ্লব’ হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে রইল।
প্রথাগতভাবে তামিল মুখ্যমন্ত্রী মানেই সাদা শার্ট আর লাল-কালো পাড়ের ভেস্টি। কিন্তু বিজয় সেই ধারায় কুঠারাঘাত করলেন। স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢোকার সময় পরনে চাপিয়ে নিলেন একটি ডার্ক ব্লেজার— যা তাকে এক মুহূর্তেই ফিল্মি সুপারস্টার থেকে আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করল। বক্তৃতায় নিজের সাধারণ শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিজয় বলেন, “আমি কোনও ঈশ্বরের দূত নই, অতি সাধারণ এক মানুষ। সহকারী পরিচালকের ঘরে আমার জন্ম, দারিদ্র্য আর খিদে কী তা আমি জানি। তবে আপনারা পাশে থাকলে আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারি।”
বিজয়ের এই স্টাইলিশ অথচ পেশাদার লুক নিয়ে সমাজমাধ্যমে চর্চার শেষ নেই। প্রবীণ সাংবাদিক মালিনী পার্থসারথি টুইট করে জানিয়েছেন, বিজয়ের এই ব্লেজার আসলে দ্রাবিড় যুগের অবসান এবং জেন-জি (GenZ) প্রজন্মের উত্থানের প্রতীক। ১ কোটি ২২ লক্ষ তরুণ ভোটারের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিজয় বুঝিয়ে দিলেন, তামিল রাজনীতিতে এখন নতুন প্রজন্মের শাসনকাল। তেলুগু নিউজ পোর্টালগুলোও তাকে ‘নিউ-জেন পলিটিশিয়ান’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে বলছে, কাজের ক্ষেত্রেও যেন তিনি এই আধুনিকতা বজায় রাখেন।
তবে এই ‘সাধারণ মানুষ’ বা ‘আম আদমি’ সাজার রাজনীতির বিপদও আছে। অনেকেই দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়ালের উদাহরণ টেনে সতর্ক করছেন। কেজরিওয়ালও ঢিলেঢালা শার্ট আর সোয়েটার পরে রাজনীতির প্রথা ভাঙতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষমেশ তার ‘শীশমহল’ বিতর্ক এবং দুর্নীতির অভিযোগ তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। তামিলনাড়ুর ডাক্তার কার্তিক বালাচন্দ্রন লিখেছেন, “ছোটবেলা থেকে সাদা জামা-ভেস্টি পরা ‘কালো মনের’ মানুষদের রাজনীতি দেখে আসছি, বিজয়কে এই ছক ভাঙতে দেখে ভালো লাগছে।”
বিজয় কি শেষ পর্যন্ত এই ‘কমন ম্যান’ ইমেজ ধরে রাখতে পারবেন? নাকি সময়ের সঙ্গে তিনিও সেই পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির চোরাবালিতে হারিয়ে যাবেন? নির্বাচনী প্রচারে সাদা শার্ট-প্যান্ট আর লাল উত্তরীয় ছিল তার চেনা সাজ, আর আজ শপথের মঞ্চে ব্লেজার। এই সাজপোশাক যদি কেবল অভিনয়ের অংশ না হয়ে দায়বদ্ধতার প্রতীক হয়, তবেই তামিলনাড়ু এক নতুন ভোরের মুখ দেখবে। আপাতত বিজয়ের পেশাদার লুকের আড়ালে এক জনদরদী শাসকের অপেক্ষায় তামিল জনতা।















