আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজার আগেই কেরল রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। বিশেষ করে তালিপারাম্বা কেন্দ্রে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (LDF) প্রার্থী হিসেবে পি.কে শ্যামলার নাম ঘোষণা হতেই নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে ২০১৬-র সেই মর্মান্তিক সাজন পারায়িল আত্মহত্যা মামলা। বছর দশেক আগের সেই ক্ষত কি এবার ভোটে শাসক শিবিরের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে? প্রশ্ন তুলছে রাজনৈতিক মহল।

২০১৯ সালে কান্নুর নিবাসী অনাবাসী ভারতীয় উদ্যোক্তা সাজন পারায়িল নিজের তৈরি ১৬ কোটি টাকার কনভেনশন সেন্টারের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট না পেয়ে আত্মঘাতী হন। তৎকালীন আন্তুর পুরসভার চেয়ারপার্সন পি.কে শ্যামলার বিরুদ্ধে মানসিক হেনস্থা ও লাল ফিতের ফাঁসের অভিযোগ উঠেছিল। দীর্ঘ সময় পর সেই শ্যামলাকেই তালিপারাম্বা বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী করায় দলের অন্দরেই ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে।

১৬ মার্চ দীর্ঘ ছয় দশকের বামপন্থী কর্মী টি.কে গোবিন্দন দল ত্যাগ করে শ্যামলার বিরুদ্ধে নির্দল হিসেবে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, জেলা স্তরের বিরোধিতা সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের আশীবাদে শ্যামলার ওপর প্রার্থীপদ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সিপিএম তড়িঘড়ি গোবিন্দনকে দল থেকে বহিষ্কার করলেও, এই বিদ্রোহ আসলে নিচুতলার কর্মীদের অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।

আন্তুর বা মারাদুর মতো ঘটনাগুলো বারবার কেরলের পঞ্চায়েত ও পুরসভা স্তরে দুর্নীতির কঙ্কালসার চেহারাটা সামনে এনেছে। আন্তুর পুরসভার একচ্ছত্র বাম শাসিত কাউন্সিল যেভাবে একজন বিনিয়োগকারীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তা আজও মানুষের মনে টাটকা। এর ফলে বিদেশের মাটিতে থাকা মালয়ালি প্রবাসীরা এখন নিজেদের রাজ্যে বিনিয়োগ করতে রীতিমতো আতঙ্ক বোধ করছেন।

১৯৯৬ সালে কেরল যে 'জনপরিকল্পনা অভিযান' (People's Plan Campaign) শুরু করেছিল, তার লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষমতার এই বিকেন্দ্রীকরণ আসলে প্রশাসনিক দুর্নীতি আর স্বজনপোষণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ বিরোধীদের। মারাদুর ফ্ল্যাট ভাঙার ঘটনায় যেভাবে সাধারণ মানুষ নিজেদের আজীবনের সঞ্চয় হারিয়েছেন, তা আজও স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

কেরলে ইউডিএফ (UDF) ইতিমধ্যেই পুরসভা নির্বাচনে শহরাঞ্চলে ভালো ফল করেছে। এই আবহে বিধানসভা নির্বাচনেও যদি শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি এবং পরিবেশের মতো বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রে থাকে, তবে তা এলডিএফ-এর জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে। অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকরা সতর্ক করছেন যে, কেরলের বেশি আত্মহত্যার হার এবং যুবসমাজের বেকারত্বের পেছনে এই একদলীয় আধিপত্য ও প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা অনেকাংশে দায়ী।

আগামী নির্বাচন কেবল ভোটদান নয়, বরং কেরলের স্থানীয় স্বশাসন ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি বড় সুযোগ। ভোটাররা কি পুরোনো সেই ক্ষত ভুলে শ্যামলাদের জয়ী করবেন, নাকি স্বচ্ছ শাসনের পক্ষে রায় দেবেন—তার উত্তর মিলবে ব্যালটেই।