আজকাল ওয়েবডেস্ক: মহারাষ্ট্রের নাসিকে টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস)-এর একটি ইউনিটে কী ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হত কর্মীদের তার আরও এক উদাহরণ সামনে এল। সংস্থাক ছ’জন মহিলা কর্মী এখনও পর্যন্ত যৌনহেনস্থা এবং জোর করে ধর্মান্তকরণের চেষ্টার অভিযোগ করেছেন। এই ঘটনায় নাসিক পুলিশ এখনও পর্যন্ত আট জনকে গ্রেপ্তার করেছে। টিসিএস জানিয়েছে, তাঁদের যৌনহেনস্থার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। অফিযোগ সামনে আসার পরেই অভিযুক্ত কর্মীদের সাসপেন্ড করা হয়েছে। তবে সংস্থার দাবি, তাদের পশ বা এথিক্স চ্যানেলে এ ধরনের অভিযোগ আগে আসেনি। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীস এই ঘটনাকে ‘কর্পোরেট জিহাদ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, এক সদ্যবিবাহিতা টিসিএসের নাসিক শাখায় ‘অ্যাসোসিয়েট’ হিসেবে যোগ দেন কয়েক মাস আগে। তাঁর অভিযোগ, অফিসে সহকর্মীরা তাঁকে ‘প্লেয়ার’, ‘জিরো ফিগার’ ইত্যাদি নানাভাবে কটাক্ষ করতেন। এছাড়াও তাঁর পুরুষ সহকর্মীরা হিন্দু দেবদেবী নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতেন বলেও অভিযোগ করেছেন ওই মহিলা। এমনকি অশালীন ইশারাও করা হত বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তিনি নাসিকে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। তাঁর স্বামী পুনেতে কাজ করেন। তাঁর কথায়, “২০ জুন ২০২৫-এ আমার বিয়ের পর আমি টিসিএস নাসিক ব্রাঞ্চে ‘অ্যাসোসিয়েট’ হিসেবে যোগ দিই। ২৪ জুন থেকে আমার তিন মাসের জন্য ট্রেনিং শুরু হয়। আমার ট্রেনিং লিডার ছিলেন শাহরুখ কুরেশি এবং জয়েশ গুঞ্জাল।”
তাঁর অভিযোগ, রাজা মেনন নামে এক টিম লিড বারবার তাঁকে বিরক্ত করতেন। তিনি ট্রেনিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তবুও বারবার বিরক্ত করতে আসতেন। তিনি ভুক্তভোগীকে বলতেন, “তোমার বর তো অনেক দূরে থাকেন। সব কিছু এক হাতে সামলাও কীভাবে? ভয় লাগে না তোমার? যদি তোমার কখনও কিছু দরকার হয় আমাকে জানিও কিন্তু। আমি যে কোনও সময়ে তোমাকে সাহায্য করতে পারি।”
ভুক্তভোগীর কথায় অভিযুক্ত আরও নানা কথা জিজ্ঞেস করতেন। যেমন, ‘তুমি কি সবে সবে বিয়ে করেছ?’ বা ‘হানিমুনে কোথায় গিয়েছিলে?’ এরকম নানা প্রশ্ন। রাজা এই ধরণের কথা বললে শাহরুখ কুরেশিও এসব কথায় তাঁকে উৎসাহ দিতেন বলে অভিযোগ করেছেন ওই মহিলা। শাহরুখ জিজ্ঞেশ করতেন, “তিনি প্রেম করে বিয়ে করেছেন নাকি, বাড়ি থেকে দেখাশোনা করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
তাঁরা মহিলাকে নানান অছিলায় বিরক্ত করতেন। বলতেন, ‘তোমার তো তাহলে অগুনতি প্রেমিক রয়েছেন’, ‘এতো প্রেমিক ছেড়ে বিয়ে করলে কী করে?’ ‘যদি তোমার পরিবার তোমার সমস্ত প্রেমিকদের খুঁজে পেয়ে যান তাহলে তুমি কী করবে?’ ইত্যাদি।
মহিলার কথায়, ‘রাজা আমাকে ‘প্লেয়ার’ বলে ডাকে। আমি যখনই অফিসে আসি আমাকে ‘প্লেয়ার’ বলে টোন কাটা হয়। আমি কোনও কাজে আটকে গেলে রাজা এসে বলত, কীহল প্লেয়ার? পারছ না?’ তিনি মহিলা পুলিশ অফিসারকে আরও জানিয়েছেন, ‘আমার বিবাহজীবনের ব্যাপারে ওদের আগ্রহের শেষ ছিল না। আমার বর কেন ঘনঘন বাড়ি আসে না, দু’জন আলাদা কেন থাকি ইত্যাদি নানা কথা ওরা সব সময়েই বলত।’
তিনি আরও জানান, “আমি মার্চ মাসের এক বিশেষ দিনে শাড়ি পরে এসেছিলাম। আমি অফিসের প্যান্ট্রি পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমার আঁচল ধরে কেউ টান দিল। আমি যখন পিছন ঘুরে তাকালাম, দেখলাম রাজা আমার আঁচল ধরে টানছে। আমি তক্ষুনি এক হেঁচকা টানে আঁচল ছাড়িয়ে নিলাম। তখন অস্বস্তিকরভাবে রাজা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল।”
গত রবিবার রাজা এবং তাঁর পরিবার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, এই অভিযোগ নিছক ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু না। ‘অফিস পলিটিক্স’ বলে তাঁরা এই অভিযোগকে দাগিয়ে দিয়েছে। যদিও রাজা-সহ আরও আট জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বিষয়টির গুরুত্ব মাথায় রেখে টিসিএস একটি প্যানেল গঠন করেছে। অন্য আর একটি সংস্থাকেও তদন্তে যুক্ত করা হয়েছে। ট্রেনিং শেষে নববিবাহিতা নতুন টিমে যোগ দেন। সেখানে আসিফ আনসারি নামে এক কর্মী তাঁকে হেনস্তা করতেন বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন ওই মহিলা। তাঁর অভিযোগ, ‘আসিফ আমার শরীরের নানা জায়গায় হাত দিত। অন্য অনেক জায়গা ফাঁকা থাকলেও আমার পাশে এসেই বসত। অহেতুক হাত ধরে টানত। এবং আমার ঊরুতেও হাত দিত। অস্বস্তি ফেলে দিত।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘একবার আমার পেটে হাত দিয়ে আমার খুব কাছাকাছি এসে ফিস ফিস করে বলে আমার জিরো ফিগার।’
আসিফ মাঝে মাঝেই অভিযোগকারিনীকে জিজ্ঞেশ করতেন, মহিলা তাঁকে পছন্দ করেন কিনা। মহিলা কোনও উত্তর না দিলে তিনি বলতেন, ‘আমি কোনও উত্তর না পেলে কিন্তু খুব রেগে যাব।’ আসিফ ইনস্টাগ্রামে তাঁকে ফলো করতেন। তিনি ব্লক করলে, লিঙ্কডইনে মেসেজ করতে থাকেন।
মহিলার কথায় নাসিকে টিসিএসের ভয়াবহ কাজের পরিবেশের কথা উঠে এসেছে। পুলিশের জানিয়েছে, এখনও তদন্ত চলছে। তবে ঘটনাটি গোটা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।















