আজকাল ওয়েবডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সামরিক উত্তেজনার আবহে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লাহ খামেইনেইর মৃত্যুর খবরে রবিবার দেশজুড়ে শোক ও প্রতিবাদের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় তাঁর নিহত হওয়ার খবর ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই কাশ্মীর উপত্যকা, লাদাখ, উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, কর্নাটক-সহ শিয়া অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায় কাশ্মীরে। শ্রীনগর শহর, লাল চক, সাইদা কাদল, বুদগাম, বান্দিপোরা, অনন্তনাগ, পুলওয়ামা-সহ উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শোকমিছিল বের হয়। কালো পতাকা, খামেনেইর ছবি এবং ইরানের সমর্থনে ব্যানার হাতে মিছিলে অংশ নেন বহু মানুষ। নওহা পাঠ ও বুক চাপড়ে মাতমে মুখর হয়ে ওঠে শহরের একাধিক এলাকা। এক প্রতিবাদী বলেন, “আমাদের প্রিয় নেতা শহিদ হয়েছেন। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে শোক পালন করছি।” বহু মহিলা ও শিশুর উপস্থিতিও চোখে পড়ে মিছিলে।
#WATCH | Women and children of the Shia Muslim community mourn the death of Iran's Supreme Leader, Ayatollah Ali Khamenei, in the Bathindi area of Jammu pic.twitter.com/sMfREqiU6z
— ANI (@ANI)Tweet by @ANI
প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শ্রীনগরে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। আগামী দু’দিন স্কুল-কলেজে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিশাল পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের ডিজিপি নলিন প্রভাত নিজে রাস্তায় নেমে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। যদিও উত্তেজনা ছিল, বড় ধরনের হিংসার খবর মেলেনি। উপত্যকায় প্রায় ১৫ লক্ষ শিয়া বাস করেন, এবং তাঁদের একাংশের কাছে খামেনেই ছিলেন গভীর প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব—রবিবারের শোকমিছিল তারই প্রমাণ বহন করে।
কাশ্মীরের ধর্মীয় নেতা Mirwaiz Umar Farooq এক্স-এ শোকপ্রকাশ করে এই হত্যাকে “নৃশংস” বলে অভিহিত করেন এবং মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। মুতাহিদা মজলিস-এ-উলামা সোমবার সম্পূর্ণ বন্ধের ডাক দিয়েছে এবং তা শান্তিপূর্ণভাবে পালনের অনুরোধ জানিয়েছে।
#WATCH | Lucknow, UP: Shia community people put up posters and black flags outside their houses and buildings in the Chowk area, mourning the death of Iranian Supreme Commander Ayatollah Ali Khamenei. pic.twitter.com/UeVGdxSbbI
— ANI (@ANI)Tweet by @ANI
উত্তর প্রদেশের লখনউ ও অন্যান্য শহরেও শিয়া সম্প্রদায়ের উদ্যোগে শোকমিছিল হয়। ধর্মগুরু Maulana Syed Kalbe Jawad এই হামলাকে “কাপুরুষোচিত” আখ্যা দিয়ে তিন দিনের শোক পালনের ঘোষণা করেন। তিনি স্বেচ্ছায় দোকানপাট বন্ধ রাখা ও মোমবাতি মিছিলের আহ্বান জানান। বেরেলিতে Maulana Shahabuddin Razvi Barelvi প্রধানমন্ত্রীকে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়ে বলেন, যুদ্ধ নয়, সংলাপই একমাত্র পথ।
&t=21sপাঞ্জাবের লুধিয়ানায় ঐতিহাসিক ফিল্ডগঞ্জ মসজিদের বাইরে শাহী ইমাম Maulana Mohammad Usman Rahmani Ludhianvi-র নেতৃত্বে বিক্ষোভ হয়। সেখানে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কুশপুতুল দাহ করা হয়। লাদাখেও শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণ শোকমিছিল করেন।
কর্নাটকের চিক্কাবল্লাপুর জেলার শিয়া অধ্যুষিত আলিপুরা গ্রামে তিন দিনের শোক পালিত হচ্ছে। স্থানীয় মসজিদে বিশেষ প্রার্থনা সভা হয়, দোকানপাট স্বেচ্ছায় বন্ধ রাখা হয় এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। গ্রামে খামেনেইর নামে একটি হাসপাতাল রয়েছে; সেখানেও শ্রদ্ধা জানানো হয়।
জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ শান্ত থাকার আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরানে থাকা রাজ্যের পড়ুয়া ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদেশ মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রশাসনকে সংযম বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে শোকপালন শান্তিপূর্ণ থাকে।
আন্তর্জাতিক স্তরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, সমন্বিত অভিযানে খামেনেই নিহত হয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অভিযানকে “অপারেশন এপিক ফিউরি” এবং ইজরায়েল “অপারেশন লায়ন’স রোর” নামে অভিহিত করেছে। হামলার লক্ষ্য ছিল তেহরান-সহ একাধিক এলাকা। পাল্টা হিসেবে ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম নেতৃত্ব এই হত্যার তীব্র নিন্দা জানালেও, অনেকেই শান্তি ও সংলাপের পথেই সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। কাশ্মীর প্রশাসন জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যে ভারতের ভেতরেও গভীর আবেগের সঞ্চার করেছে, রবিবারের ঘটনাপ্রবাহ তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত।
