আজকাল ওয়েবডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন যুদ্ধের দামামা আরও তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই কূটনৈতিক মঞ্চে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিল ভারত। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধের ঘোষণা করে বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছেন, ঠিক সেই আবহেই দিল্লিতে ইরান দূতাবাসে গিয়ে সে দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর শোকসভায় যোগ দিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পবিত্র মার্ঘেরিটা। রবিবার (১২ এপ্রিল) খামেনেইর প্রয়াণের ৪০তম দিন বা ‘চেহলাম’ উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মন্ত্রীর উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিল যে, মার্কিন চাপের মুখেও তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সভ্যতা ও সংস্কৃতিগত সম্পর্ককে খাটো করে দেখছে না নয়াদিল্লি।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ মিসাইল হামলায় খামেনেইর মৃত্যুর পর থেকেই গোটা পশ্চিম এশিয়া আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এর আগে ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিসরি শোকবইয়ে স্বাক্ষর করে এলেও, এবার একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পাঠিয়ে ভারত ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিল। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পবিত্র মার্ঘেরিটা গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। যদিও এই সংঘাতের শুরুতে ভারত সরাসরি কোনও নিন্দাসূচক বিবৃতি দেয়নি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরব দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপে ইরানের নাম না করেই মিসাইল হামলার সমালোচনা করেছিলেন, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের এই ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্য রক্ষার নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে পরিস্থিতি এখন অগ্নিগর্ভ। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে টানা ২১ ঘণ্টা ম্যারাথন বৈঠক করলেও শেষ পর্যন্ত কোনও রফাসূত্র মেলেনি। এর পরেই ক্ষুব্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ঘোষণা করেন যে, আমেরিকা হরমুজ প্রণালীতে কড়া নৌ-অবরোধ শুরু করবে এবং কোনও জাহাজকেই সেখান দিয়ে যাতায়াত করতে দেওয়া হবে না। ট্রাম্পের অভিযোগ, ইরান এই আন্তর্জাতিক জলপথকে হাতিয়ার করে ‘তোলাবাজি’ চালাচ্ছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন যেখানে ১৫০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত, গত কয়েক সপ্তাহে তা কমে মাত্র ১৫-২০টিতে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে হাহাকার শুরু হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের এই আঁচ এসে লেগেছে ভারতের রান্নাঘরেও। গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশ এখন এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের চরম সংকটের মুখোমুখি। কারণ ভারত তার চাহিদার বড় অংশই এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আমদানি করে। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, সংকট সামাল দিতে ভারত সরকার কার্যত বাধ্য হয়েই আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দুটি ইরানি কার্গো জাহাজকে ভারতীয় বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজ বেশ পুরনো এবং অন্যটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা সত্ত্বেও, দেশের মানুষের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে নয়াদিল্লি এই বিশেষ ছাড় বা ‘ওয়েভার’ দিয়েছে। শিল্পক্ষেত্রে গ্যাসের ব্যবহারে কিছুটা কাটছাঁট করে আপাতত গৃহস্থালির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে সরকার।
এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়েও মুখ খুলেছেন। গত বছর মে মাসে দুই দেশের মধ্যে হওয়া চার দিনের সামরিক সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেছেন যে, তাঁর হস্তক্ষেপেই ভারত ও পাকিস্তান বড় ধরণের যুদ্ধ থেকে বিরত হয়েছে। ট্রাম্প এমনকি দাবি করেছেন যে, পাকিস্তানের নেতারা তাঁকে জানিয়েছেন তিনি নাকি ৩ থেকে ৫ কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। যদিও ভারতের পক্ষ থেকে সব সময় বলা হয়েছে যে, সেনাপর্যায়ে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই সীমান্ত পরিস্থিতি শান্ত হয়েছিল। ট্রাম্পের এই ব্লকহেড ঘোষণা বা ভারত-পাক মন্তব্য নিয়ে দিল্লি এখনো সরকারিভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি, তবে পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের এই সন্তর্পণে পা ফেলা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, জাতীয় স্বার্থ আর আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন মোদি সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।















