আজকাল ওয়েবডেস্ক: একটা সময় ছিল যখন ভারতীয় টাকা শুধু ভারতেই নয়, অনেক উপসাগরীয় দেশেও ব্যবহৃত হত। চলুন জেনে নেওয়া যাক কেন সেই উপসাগরীয় দেশগুলি ভারতীয় টাকার ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছিল।
ভারতীয় টাকার ইতিহাস
উনিশ শতক থেকে বিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতীয় টাকা শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, ওমান এবং পরবর্তীকালে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-সহ বেশ কয়েকটি আরব উপসাগরীয় দেশের সরকারি ও প্রধান মুদ্রা ছিল। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতীয় টাকা ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যের মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছিল। এটি ব্যবসায়ীদের কাছে বিশ্বস্ত ছিল। তবে ধীরে ধীরে উপসাগরীয় দেশগুলি এই মুদ্রা পরিত্যাগ করে।
আরব দেশগুলিতে ভারতীয় টাকা কেন ব্যবহার করা হত?
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ভারত ছিল সুয়েজের পূর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক কেন্দ্র। উপসাগরীয় দেশগুলি ছিল ব্রিটিশ সংরক্ষিত রাজ্য এবং আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে সেখানে ভারতীয় টাকা চালু করা হয়েছিল। এটি বাণিজ্য, বেতন এবং সঞ্চয়ের জন্য একটি বৈধ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হত। টাকা স্থিতিশীল ছিল এবং এর প্রাথমিক বছরগুলোতে এটি রুপো দ্বারা সমর্থিত ছিল। এছাড়াও, পূর্ব আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা এটি গ্রহণ করতেন। উপসাগরীয় অর্থনীতির জন্য টাকা ছিল একটি সুবিধাজনক ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প।
সোনা চোরাচালান
১৯৫০-এর দশকে রুপির আন্তর্জাতিক মর্যাদা একটি বড় ধাক্কা খায়। ভারত সোনার আমদানির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, যার ফলে দেশের অভ্যন্তরে সোনার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলিতে সোনা অনেক সস্তা এবং সহজলভ্য ছিল। চোরাকারবারিরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। তারা ভারতীয় টাকা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলিতে যেত এবং তার বিনিময়ে সোনা কিনত। এরপর তারা সেই সোনা ভারতে পাচার করে বিপুল লাভে বিক্রি করত। উপসাগরীয় দেশগুলিতে জমা হওয়া টাকা তখন বিদেশি ব্যাঙ্কগুলিতে জমা করা হত, যারা পরবর্তীতে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছ থেকে তা রূপান্তরের জন্য আবেদন করত। এই অবৈধ বাণিজ্য ভারতের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে উদ্বেগজনক হারে কমিয়ে দেয়।
গাল্ফ রুপির জন্ম
১৯৫৯ সালে ভারত ‘গাল্ফ রুপি’ নামে একটি বিশেষ মুদ্রা চালু করে। এটি দেখতে ভারতীয় রুপির মতোই ছিল, কিন্তু এর রঙ ছিল ভিন্ন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই মুদ্রাটি শুধুমাত্র উপসাগরীয় দেশগুলিতেই বৈধ ছিল, ফলে ভারতে এর ব্যবহার অবৈধ ছিল। এর ফলে সোনা পাচার কমে যায় এবং ভারতের রিজার্ভ সুরক্ষিত হয়।
১৯৬৬ সালে মুদ্রার অবমূল্যায়ন
১৯৬৬ সালে ভারত গুরুতর অর্থনৈতিক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়। ভারতীয় টাকার মূল্য প্রায় ৫৭% হ্রাস পায়। যেহেতু গাল্ফ রুপি ভারতীয় টাকার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাই রাতারাতি এর মূল্যও ব্যাপকভাবে কমে যায়। উপসাগরীয় দেশগুলি এর ফলে আকস্মিক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আমদানির খরচ বেড়ে যায়, সঞ্চয়ের মূল্য হ্রাস পায় এবং রুপির উপর আস্থা কমে যায়। এর ফলস্বরূপ, উপসাগরীয় দেশগুলি দ্রুত তাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার দিকে এগিয়ে যায়। কুয়েত ১৯৬১ সালে কুয়েতি দিনার প্রবর্তন করে এবং বাহরাইন ১৯৬৫ সালে একই পথ অনুসরণ করে। কাতার ও দুবাই ১৯৬৬ সালে একটি যৌথ রিয়াল চালু করে এবং ওমান ১৯৭০ সালে গাল্ফ রুপির পরিবর্তে ওমানি রিয়াল প্রবর্তন করে।
