আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতকে 'মহান' বা প্রধানমন্ত্রী মোদিকে 'ভাল বন্ধু' বলেও ড্যামেজ কন্ট্রোল হল না। বৃহস্পতিবার ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেছে। ট্রাম্প এমন একটি পোস্ট সমর্থন করেছিলেন, যেখানে ভারতকে 'পৃথিবীর বুকে এক নরককুণ্ড (হেল-হোল)' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। ভারত বলেছে, এ ধরনের মন্তব্য 'অজ্ঞতাপ্রসূত, অনুচিত এবং কুরুচিপূর্ণ'। হুঁশিয়ারির সুরেই নয়াদিল্লি জানিয়েছে যে, এসব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত রূপকে প্রতিফলিত করে না।

সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, নয়াদিল্লি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করা মূল মন্তব্য এবং পরবর্তীতে মার্কিন দূতাবাস থেকে দেওয়া ব্যাখ্যা, উভয়ই নজরে রেখেছে। 

জয়সওয়াল বলেন, "আমরা ওই মন্তব্যগুলো দেখেছি, পাশাপাশি এর জবাবে মার্কিন দূতাবাস থেকে দেওয়া পরবর্তী বিবৃতিটিও দেখেছি। মন্তব্যগুলো স্পষ্টতই অজ্ঞতাপ্রসূত, অনুচিত এবং কুরুচিপূর্ণ। এগুলো নিশ্চিতভাবেই ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না, যে সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভিন্ন স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।"

এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় তখন, যখন ট্রাম্প 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে রক্ষণশীল রেডিও উপস্থাপক মাইকেল স্যাভেজের একটি বিষয়বস্তু রিপোস্ট করেন। স্যাভেজ তাঁর মন্তব্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব' নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে ভারত ও চীন-সহ বেশ কিছু দেশকে 'পৃথিবীর বুকে নরককুণ্ড (হেল-হোল)' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

নিজের 'স্যাভেজ নেশন' পডকাস্টে স্যাভেজ 'নাগরিকত্ব ধারা' বা Citizenship Clause-এর বিরুদ্ধে যুক্তি তুলে ধরেন। এই ধারা অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্মগ্রহণকারী অধিকাংশ শিশুই মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করে, এমনকি তাদের বাবা-মা যদি নথিপত্রহীন বা সাময়িকভাবে দেশটিতে বসবাসকারীও হন, তবুও। স্যাভেজ দাবি করেন, ভারত ও চীনের মতো দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীরা এই নীতির অপব্যবহার করছে।

ট্রাম্পের শেয়ার করা মন্তব্যে স্যাভেজ বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী একটি শিশু 'মুহূর্তের মধ্যেই নাগরিকত্ব' পেয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ভারত ও চীন-সহ বিভিন্ন দেশের তার পরিবারের সদস্যদেরও সেখানে অভিবাসনের সুযোগ করে দেয়। ওই বার্তায় বলা হয়েছে, "এখানে জন্ম নেওয়া একটি শিশু মুহূর্তের মধ্যেই নাগরিক হয়ে যায়, এরপর তারা চীন, ভারত কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনও 'নরককুণ্ড (হেল-হোল)' থেকে তাদের পুরো পরিবারকে এখানে নিয়ে আসে।"

ট্রাম্প ওই পডকাস্টের লিখিত প্রতিলিপি এবং ভিডিও ক্লিপ, উভয়ই ফের পোস্ট করেন। ওই ভিডিওতে স্যাভেজ জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকার সমালোচনা করেন এবং দাবি জানান যে, এই বিষয়টি একটি জাতীয় গণভোটের মাধ্যমে মীমাংসা করা উচিত।

স্যাভেজের মন্তব্যের সঙ্গে যুক্ত বার্তায় আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ভারতীয় ও চীনা অভিবাসীদের 'ল্যাপটপধারী গুন্ডা'  হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যারা নাকি 'আমাদের পতাকাকে পদদলিত করেছে'।

এর আগে দিনের শুরুতে ভারত সরাসরি ট্রাম্পের সমালোচনা না করলেও, পরোক্ষভাবে নিজেদের অসন্তোষের বিষয়টি বুঝিয়ে দিয়েছিল। এই বিতর্ক সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “আমরা কিছু প্রতিবেদন দেখেছি। আমি বিষয়টি এখানেই শেষ করছি।”

ট্রাম্পের মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরেই মার্কিন দূতাবাস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কাজে নামে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কের ওপর জোর দেয়। দূতাবাসের একজন মুখপাত্র বলেন, “প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘ভারত একটি মহান দেশ, যার শীর্ষস্থানে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু রয়েছেন’।”

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প স্যাভেজের মন্তব্যটিকে বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তাঁর প্রশাসন নিম্ন আদালতের সেই রায়গুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্মগ্রহণকারী নির্দিষ্ট কিছু শিশুর স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব সীমিত করার লক্ষ্যে জারি করা একটি নির্বাহী আদেশকে আটকে দিয়েছিল।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পরপরই স্বাক্ষরিত এই আদেশটির লক্ষ্য ছিল সেইসব শিশু, যাদের বাবা-মা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে কিংবা সাময়িকভাবে বসবাস করছেন। এই আদেশের ফলে একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জের তৈরি হয়, বেশ কয়েকটি আদালত এর বাস্তবায়ন আটকে দেয় এবং অন্তত একজন বিচারক এটিকে অসাংবিধানিক হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী মোদির তীব্র সমালোচনা
এই বিতর্কের জেরে ট্রাম্পের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নীরবতা নিয়ে বৃহস্পতিবার প্রশ্ন তোলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। তিনি জানতে চান, ১৪০ কোটি ভারতীয়র প্রতি এই “হুমকি” এবং “অপমানের” বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর মতো সময় তিনি পাবেন কি না। তিনি আরও জানতে চান, প্রধানমন্ত্রী মোদি ঠিক কী নিয়ে ভীত এবং কোন বিষয়টি ভারতকে মার্কিন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এই বিষয়টি উত্থাপন করা থেকে বিরত রাখছে?

মল্লিকার্জুন টুইট করেন, “মোদিজির প্রিয় বন্ধু - যাঁর জন্য ‘নমস্তে ট্রাম্প’ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল - তিনি একটি বার্তা শেয়ার করেছেন যেখানে ভারতকে গালিগালাজ করা হয়েছে এবং অত্যন্ত অবমাননাকর একটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এই হাস্যকর মন্তব্যের বিষয়ে মোদীজি সম্পূর্ণ নীরব। বিদেশ মন্ত্রেকর মুখপাত্র বলেছেন, ‘আমি বিষয়টি এখানেই শেষ করছি’।”

কংগ্রেস সবাপতি প্রশ্ন তোলেন, “নরেন্দ্র মোদিজি, আপনি কী নিয়ে ভীত? আমেরিকার সাফল্যের পেছনে ভারতীয়দের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মার্কিন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এই বিষয়টি উত্থাপন করা থেকে আমাদের কিসে বিরত রাখছে?”