আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারত ও কানাডা- দুই দেশই তাদের সম্পর্ক মেরামতিতে জোর দিয়েছে। উভয় পক্ষই পরিমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করেছে। গত সপ্তাহে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) অজিত ডোভালের অটোয়া সফর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যে অন্যতম সারগর্ভ উচ্চ-পর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠক ছিল। ২০২৩ সালে একজন খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদী হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক বিরোধের পর দীর্ঘদিন দুই দেশের সম্পর্ক তলানীতে পৌঁছায়। কিন্তু জাতীয় নিপত্তা উপদেষ্টাস্তরের বৈঠক অতীতের সুসম্পর্ক সতর্ক প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত।
৬ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি অজিত ডোভাল কানাড়া সফর করেন। সেই সময়ে কানাডার ডেপুটি ক্লার্ক এবং প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা উপদেষ্টা নাথালি ড্রুইন এবং জননিরাপত্তা মন্ত্রী গ্যারি আনন্দাসাঙ্গারীর সঙ্গে দেখা করেন ডোবাল। উভয় পক্ষই এই আলোচনাকে তাদের নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সংলাপের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে, কিন্তু সফরের সময় এবং সুর ইঙ্গিত দেয় যে এটা প্রাক্তন কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর মেয়াদে একাধিক ধাক্কা খাওয়া সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার একটি ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা।
এই সফরটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটি নতুন সূচনা চিহ্নিত করেছে এবং একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে- খালিস্তানি-সম্পর্কিত নেটওয়ার্ক-সহ চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো মার্ক কার্নি সরকারের সমর্থন কোনও মতেই পায় না, ভবিষ্যতেও পাবে না।
বৈঠকের ফলাফল
বৈঠকের পর ভারতের বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, নয়াদিল্লি এবং অটোয়া উভয়ই তাদের দেশ ও নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সহায়তার লক্ষ্যে গৃহীত উদ্যোগগুলোর অগ্রগতি স্বীকার করেছে। তারা জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে, যেখানে বাস্তবসম্মত ও ফলাফল-ভিত্তিক সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কানাডার বিবৃতিতে এর প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছে, যেখানে ব্যাপক রাজনৈতিক সংকেতের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বৈঠকগুলোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য ফলাফল ছিল একে অপরের দেশে নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য লিয়াজোঁ কর্মকর্তা নিয়োগের সিদ্ধান্ত।
কর্মকর্তারা বলেছেন, এটা দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগকে সহজ করতে এবং পারস্পরিক উদ্বেগের বিষয়গুলোতে সময়মতো তথ্য আদান-প্রদান সক্ষম করবে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তঃদেশীয় সংগঠিত অপরাধ, মাদকের অবৈধ প্রবাহ - বিশেষ করে ফেন্টানিলের পূর্বসূরী পদার্থ—এবং অন্যান্য সীমান্ত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ যা উভয় সরকারকেই ক্রমবর্ধমানভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
আলোচনায় সাইবার নিরাপত্তা নীতি এবং সাইবার হুমকি সম্পর্কিত তথ্য আদান-প্রদান, পাশাপাশি জালিয়াতি ও অভিবাসন প্রয়োগের বিষয়ে ধারাবাহিক সহযোগিতার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। উভয় পক্ষই জোর দিয়েছে যে, এই ধরনের সহযোগিতা দেশীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবে, যা অতীতের বিরোধ এবং সম্পর্ক পুনর্গঠনের সময় প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার প্রতি সংবেদনশীলতার ইঙ্গিত দেয়।
বিবৃতিগুলোতে শব্দচয়ন সতর্কতার সঙ্গে করা হলেও, বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট এই সফরকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে। নয়াদিল্লি এবং অটোয়ায় ডোভালের বৈঠকগুলোকে আগামী মাসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সম্ভাব্য ভারত সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি এই সফর নিশ্চিত হয়, তবে এটা হবে গত কয়েক দশকের মধ্যে সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক।
ভারত-কানাডা সম্পর্ক
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর শাসনকালে রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সংবেদনশীল বিষয়গুলোর কূটনৈতিক পরিচালনা নিয়ে ধারাবাহিক মতবিরোধের কারণে ভারত-কানাডা সম্পর্ক তিক্ত হয়েছিল। ২০২৩ সালে খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদী হরদীপ সিং নিজ্জারের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য ভারতীয় যোগসূত্র নিয়ে ট্রুডোর অভিযোগের পর সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকে। ভারত ট্রুডোর এই অভিযোগকে 'অযৌক্তিক' বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।
এই সময়ে উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপ, সম্পর্কের অবনতি এবং আস্থার তীব্র ক্ষয় দেখা যায়। এই প্রেক্ষাপটে, কাঠামোগত নিরাপত্তা সংলাপ পুনরায় শুরু হওয়াকে এই ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যে, উভয় দেশই এই অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে এবং সেই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী, যা একসময় এই সম্পর্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল।
উভয় পক্ষের কর্মকর্তারা বড় ধরনের পুনর্মিলনের পরিবর্তে বাস্তববাদ প্রদর্শনে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রগুলোর ওপর জোর দেওয়া থেকে বোঝা যায় যে, শুরু থেকে আস্থা পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের কার্যকরী সহযোগিতা যদি দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে, তবে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার জন্য গতি তৈরি করতে পারে।
সুতরাং, ডোভালের অটোয়া সফর হয়তো সমস্ত অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান করবে না, তবে এটা গুরুত্ব সহকারে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছার ইঙ্গিত দেয়। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরের প্রেক্ষাপটে, এই বৈঠকগুলো থেকে বোঝা যায় যে, ভারত এবং কানাডা বছরের পর বছর ধরে কঠিন সময়ের পর ধাপে ধাপে সতর্কতার সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে স্বাভাবিকতার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এবং সেই আরও অনুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল সম্পর্কের দিকে ফিরে যেতে চাইছে যা একসময় তাদের সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য ছিল।
