আজকাল ওয়েবডেস্ক: মধ্যপ্রদেশের গ্রামীণ এলাকায় পানীয় জল এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্র সরকারের জল জীবন মিশনের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন রিপোর্টে উঠে এসেছে, রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি গ্রামীণ পানীয় জল মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য। এই দূষিত জলের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন।

৪ জানুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত Functionality Assessment Report অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশে পরীক্ষিত পানীয় জলের মাত্র ৬৩.৩ শতাংশ নমুনা গুণগত মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে, যেখানে জাতীয় গড় ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ রাজ্যের ৩৬.৭ শতাংশ গ্রামীণ পানীয় জল ব্যাকটেরিয়া বা রাসায়নিক দূষণে আক্রান্ত। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে রাজ্যের ১৫,০০০-এরও বেশি গ্রামীণ পরিবারের জলের  উৎস থেকে এই নমুনাগুলি সংগ্রহ করা হয়।

রিপোর্টে আরও দেখা গেছে, রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে মাত্র ১২ শতাংশ পানীয় জলের নমুনা মাইক্রোবায়োলজিক্যাল নিরাপত্তা পরীক্ষায় পাশ করেছে, যেখানে জাতীয় গড় ৮৩.১ শতাংশ। এর অর্থ, মধ্যপ্রদেশের প্রায় ৮৮ শতাংশ সরকারি হাসপাতাল রোগীদের জন্য নিরাপদ নয় এমন পানীয় জল সরবরাহ করছে। বিদ্যালয়গুলিতেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে- ২৬.৭ শতাংশ স্কুলের পানীয় জলের নমুনা ব্যাকটেরিয়াল পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে, ফলে শিশুরা প্রতিদিন দূষিত জল পান করতে বাধ্য হচ্ছে।

আদিবাসী অধ্যুষিত জেলাগুলিতে সংকট আরও গভীর। অনুপপুর ও দিন্ডোরি জেলায় পরীক্ষা করা কোনও একটি পানীয় জলের নমুনাও নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়নি। বালাঘাট, বেতুল ও ছিন্দওয়াড়ায় অর্ধেকেরও বেশি নমুনা দূষিত পাওয়া গেছে। এই এলাকাগুলিতে দীর্ঘদিন ধরেই ডায়রিয়া ও জলবাহিত রোগের প্রকোপ থাকলেও, এই রিপোর্ট প্রথমবারের মতো সমস্যাটিকে সরকারি নথিতে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরল।

পানীয় জল সংকটের আরেকটি দিক হলো পরিকাঠামোগত ব্যর্থতা। মধ্যপ্রদেশে মাত্র ৩১.৫ শতাংশ পরিবারের কাছে নল সংযোগ রয়েছে, যেখানে জাতীয় গড় ৭০.৯ শতাংশ। যদিও সরকারি হিসেবে বলা হচ্ছে ৯৯.১ শতাংশ গ্রামে পাইপলাইন পৌঁছেছে, বাস্তবে মাত্র ৭৬.৬ শতাংশ পরিবারের নল কার্যকর। অর্থাৎ প্রতি চারটি পরিবারের একটি নল থেকে জলই আসে না। আবার যেখানে জল আসে, সেখানেও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। ইন্দোর জেলাকে সরকারি ভাবে শতভাগ সংযুক্ত ঘোষণা করা হলেও সেখানে মাত্র ৩৩ শতাংশ পরিবার নিরাপদ পানীয় জল পাচ্ছে। রাজ্য জুড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ জলের নমুনা পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় স্পষ্ট হচ্ছে, সমস্যাটি কেবল সংযোগের নয়, বরং একটি গভীর ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা।

এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র সরকার একটি “system-generated disaster” বলে অভিহিত করেছে এবং জল গুণমানের দ্রুত উন্নতি না হলে চলতি বছরে তহবিল কমানোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। এই সতর্কতার পেছনে রয়েছে ইন্দোরের ভাগীরথপুরায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনা, যেখানে দূষিত জল পান করে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ওই ঘটনায় ৪২৯ জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, যাদের মধ্যে ১৬ জন আইসিইউতে এবং তিন জন ভেন্টিলেশনে রয়েছেন।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট এই সংকটকে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে জীবনের অধিকারের মধ্যে পরিষ্কার পানীয় জলের অধিকার অন্তর্ভুক্ত এবং বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টতই জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার আওতায় পড়ে।

এই রিপোর্ট প্রকাশের পর রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থা, জল জীবন মিশনের বাস্তব রূপায়ণ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের দায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। মধ্যপ্রদেশে পানীয় জল এখন আর কেবল উন্নয়নের পরিসংখ্যান নয়, এটি প্রতিদিনের জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।