আজকাল ওয়েবডেস্ক: আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৫ সালে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ভাষণের মাত্রা এক নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের সদ্য প্রকাশিত এক বিস্তৃত রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর দেশজুড়ে অন্তত ১,৩১৮টি ঘৃণা ভাষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার লক্ষ্যবস্তু প্রধানত মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়। গড়ে প্রতিদিন চারটি করে এমন ঘটনা ঘটেছে যা ভারতের সামাজিক সহাবস্থান ও গণতান্ত্রিক পরিসরের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
এই সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি এবং ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মোট ঘটনার ৯৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই মুসলিমরা লক্ষ্যবস্তু। ১,১৫৬টি ঘটনায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে সরাসরি ঘৃণা ভাষণ দেওয়া হয়েছে, এবং আরও ১৩৩টি ঘটনায় মুসলিমদের সঙ্গে খ্রিস্টানদেরও একসঙ্গে নিশানা করা হয়েছে। মুসলিম-বিরোধী ভাষণের এই প্রবণতা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
একই সঙ্গে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাভাষণের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে মোট ১৬২টি ঘটনায় খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করা হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি। এই বৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ঘৃণা ভাষণের পরিসর এখন আর একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।
https://www.youtube.com/shorts/xqNq-VaicTw
এই অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আন্তর্জাতিক স্তরেও সতর্কবার্তা এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মিউজিয়াম প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় ভারতকে ১৬৮টি দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে রাখা হয়েছে যেসব দেশে গবেষকদের মতে রাষ্ট্রের ভেতরে গণহত্যার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, যেসব দেশে এখনো বড় আকারের হিংসা শুরু হয়নি, তাদের মধ্যে ঝুঁকির নিরিখে ভারত শীর্ষে রয়েছে।
রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যানেও চিত্রটি স্পষ্ট। উত্তরপ্রদেশে সর্বাধিক ২৬৬টি ঘৃণা ভাষণের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এর পরেই রয়েছে মহারাষ্ট্র (১৯৩), মধ্যপ্রদেশ (১৭২), উত্তরাখণ্ড (১৫৫) এবং দিল্লি এনসিআর (৭৬)। উত্তরপ্রদেশে হোলির আগে বিজেপি নেতা রঘুরাজ সিংয়ের মন্তব্য মুসলিমদের “টারপলিন দিয়ে হিজাব বানিয়ে নেওয়ার” পরামর্শ এই সাম্প্রদায়িক ভাষার নগ্ন উদাহরণ হিসেবে রিপোর্টে উঠে এসেছে।
ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে ১,১৬৪টি ঘটনা, অর্থাৎ প্রায় ৮৮ শতাংশ ঘৃণাভাষণ ঘটেছে বিজেপি-শাসিত রাজ্য বা বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অধীনে থাকা এলাকায়। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি একাই ৭১টি ঘৃণাভাষণের জন্য দায়ী বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তৃতাগুলিতে ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’ এবং ‘থুক জিহাদ’-এর মতো ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব নিয়মিতভাবে প্রচার করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর শাসনকালে মুসলিমদের সম্পত্তি ভাঙচুর ও প্রশাসনিক বৈষম্যের অভিযোগও ক্রমাগত সামনে এসেছে।
মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতা ও মন্ত্রী নিতেশ রানেও ঘৃণা ভাষণের শীর্ষ বক্তাদের মধ্যে রয়েছেন। তিনি মুসলিমদের ‘জিহাদি’, ‘সবুজ সাপ’ বলে আক্রমণ করেছেন এবং প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে তথাকথিত ‘হিন্দু রাষ্ট্রে’ সব ধর্ম সমান নয়, কারণ “হিন্দুরাই আগে”।
বিরোধী-শাসিত রাজ্যগুলিতে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম ভয়াবহ হলেও সেখানে ঘৃণা ভাষণ পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়। সাতটি বিরোধী-শাসিত রাজ্যে ২০২৫ সালে মোট ১৫৪টি ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কম। তবে এই রাজ্যগুলির মধ্যেই কর্ণাটক একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম হয়ে উঠেছে। রাজ্য সরকার ২০২৫ সালে কর্ণাটক হেট স্পিচ অ্যান্ড হেট ক্রাইমস (প্রিভেনশন) বিল পাস করেছে, যেখানে ঘৃণা ভাষণের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ইন্ডিয়া হেট ল্যাব এই আইনকে ভারতের আইনি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে অভিহিত করেছে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রায় অর্ধেক ঘৃণা ভাষণে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব যেমন ‘পপুলেশন জিহাদ’, ‘ভোট জিহাদ’ বা ‘ড্রাগ জিহাদ’ উল্লেখ করা হয়েছে। ৩০৮টি ঘটনায় সরাসরি হিংসার আহ্বান জানানো হয়েছে, এবং ১৩৬টি ভাষণে অস্ত্র ধরার ডাক দেওয়া হয়েছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের আহ্বানও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। লোকসভায় প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু ঘৃণা ভাষণ সংক্রান্ত কোনও তথ্য দিতে অস্বীকার করেন এবং দায় রাজ্য সরকারের ওপর ঠেলে দেন। সুপ্রিম কোর্টও ২০২৫ সালে আগের তুলনায় সংযত অবস্থান নিয়েছে এবং জানিয়েছে, প্রতিটি ঘৃণা ভাষণের ঘটনা নজরদারির দায়িত্ব আদালতের নয়।
ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের ভাষায়, ২০২৫ সালের এই প্রবণতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ঘৃণা ভাষণ এখন আর ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের এক স্থায়ী ও স্বাভাবিক উপাদানে পরিণত হচ্ছে, যা দেশের সংবিধান, গণতন্ত্র ও সামাজিক সংহতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আশঙ্কা তৈরি করছে।
