আজকাল ওয়েবডেস্ক: বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লি যখন আশা প্রকাশ করে বলল যে, ভারত থেকে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে ঢাকা তাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করবে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানালেন যে, ভারত থেকে সম্ভাব্য যেকোনও ধরনের 'পুশ-ইন' (জোর করে ফেরত পাঠানোর) ঘটনা রুখতে সীমান্তজুড়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি)।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ঢাকার পক্ষ থেকে এই সতর্কতা জারির ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক, বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই।
পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিপুল বিজয়ের পরপরই ঢাকার পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপ করা হল। ভারতের এই দু'টি রাজ্যের সীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে অবৈধ অভিবাসন বিষয়টি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল।
ভারতে অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিষয়ে ঢাকা যা বলেছে:
৫ মে, অর্থাৎ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ঠিক পরের দিন, বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন যে, ভারতের দিক থেকে যেকোনও ধরনের 'পুশ-ইন' বা জোর করে ফেরত পাঠানোর ঘটনার বিরুদ্ধে ঢাকা 'উপযুক্ত ব্যবস্থা' গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পর যদি কোনও ধরনের পুশ-ইন বা ফেরত পাঠানোর ঘটনা ঘটে, তবে বাংলাদেশ এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।"
'পুশ-ইন' শব্দটি ব্যবহার করে রহমান মূলত সেইসব প্রতিবেদনের প্রতি ইঙ্গিত করছিলেন, যেখানে বলা হচ্ছিল যে- যেসব বাংলাদেশি অভিবাসী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন, তাঁদের জোর করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে এমন খবর পাওয়া গিয়েছে যে, ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্য থেকে অবৈধ অভিবাসীদের আটক করে অসম ও ত্রিপুরার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। উল্লেখ্য, বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই দু'টি রাজ্যেই বিজেপির সরকার ক্ষমতায় ছিল। আর এখন পশ্চিমবঙ্গও একটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে পরিণত হতে চলেছে।
রহমানের এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ঢাকার দৃষ্টিতে এখন পশ্চিমবঙ্গকেও এই 'পুশ-ইন' বা ফেরত পাঠানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অসম সরকারকে নির্দেশ দেয় যে, যেসব ব্যক্তিকে 'বিদেশি' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটি যেন দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।
অবৈধ বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসন ভারতের একটি মূল ইস্যু: ভারত সরকার
বৃহস্পতিবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রক মুখপাত্র রণধীর জয়েসওয়াল "ভারত থেকে অবৈধ বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনের মূল ইস্যুটির" ওপর আলোকপাত করেন। বিদেশমন্ত্রী রহমানের মন্তব্যের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল বলেন, ভারত আশা করে যে- ভারতে অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশিদের যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ সরকার ত্বরান্বিত করবে।
বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক সংবাদিক বৈঠকে রণধীন জয়েসসওয়াল বলেন, "গত কয়েক দিনে আমরা এ ধরনের মন্তব্য করতে দেখেছি। এই মন্তব্যগুলোকে অবশ্যই ভারত থেকে অবৈধ বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত মূল প্রেক্ষাপটের আলোকে দেখতে হবে। আর এর জন্য স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা আশা করি, বাংলাদেশ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করবে, যাতে অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে।"
সীমান্তে সতর্কতা জারি করল ঢাকা; বিজিবিকে সতর্ক থাকার নির্দেশ
জয়েসওয়ালের মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরেই বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, "পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর ভারত থেকে সম্ভাব্য কোনও অনুপ্রবেশ বা 'পুশ-ইন' ঠেকানোর লক্ষ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সীমান্তে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।" ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র 'দ্য ডেইলি স্টার' এমনই জানিয়েছে।
তিনি বলেন, "আমরা বিজিবিকে সীমান্তে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছি। যদিও আমরা এমন কোনো সম্ভাবনার আশঙ্কা করছি না, তবুও আমরা আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি, যাতে পরিস্থিতি উদ্ভূত হলে আমরা তা মোকাবিলা করতে পারি।" তিনি আরও জানান যে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) প্রতি নতুন করে নির্দেশাবলি জারি করা হয়েছে।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং পশ্চিমবঙ্গের ভাবী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-সহ বিজেপির বেশ কয়েকজন নেতা ভারতে অবৈধ বাংলাদেশিদের ব্যাপক হারে অনুপ্রবেশের বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসীদের বিশাল ঢলের কারণে অসম ও পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায় জনমিতিক বা জনসংখ্যার বিন্যাসে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছে।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মার 'পুশ-ব্যাক' (ফেরত পাঠানো) সংক্রান্ত মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে। এক সাক্ষাৎকারে শর্মা বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির এবং হতাশাজনক, আর ঠিক এ কারণেই রাতের আঁধারের সুযোগ নিয়ে কিছু বাংলাদেশিকে "পুশ-ব্যাক" বা ফেরত পাঠানো হয়েছে।
শর্মা বলেন, "আমি যদি তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাঠাতে চাই, তবে আমাকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের দ্বারস্থ হতে হবে। এরপর বিদেশ মন্ত্রক সেই সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য বাংলাদেশের কাছে পাঠাবে। এরপর কাকে তারা ফেরত নেবে- সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের ওপরই নির্ভর করে।" এর পরিবর্তে হিমন্ত জানান যে, যেসব স্থানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উপস্থিতি নেই, সেসব জায়গায় "রাতের আঁধারের সুযোগ নিয়ে" অবৈধ অভিবাসীদের "পুশ-ইন" বা ফেরত পাঠানো হয়েছে।
শর্মা আরও জানান, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ১,৪০০ জন বাংলাদেশিকে "পুশ-ব্যাক" করা হয়েছে, তবে প্রকৃত সংখ্যাটি কয়েক হাজার হতে পারে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের (সুপ্রিম কোর্ট) একটি পর্যবেক্ষণের প্রসঙ্গ টেনে শর্মা বলেন, "গত বছর সুপ্রিম কোর্ট এক পর্যবেক্ষণে বলেছিল যে, যদি কোনও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে মনে হয় যে কোনও ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক নন, তবে তার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ বা বহিষ্কারের নির্দেশ জারি করা যেতে পারে। তবে, সেই আদেশে উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি ঠিক কীভাবে সম্পন্ন করতে হবে- সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।"
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর শঙ্কিত বাংলাদেশ
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপির জয়ের পর বাংলাদেশে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের এই উদ্বেগের মূল কারণ হল অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে বিজেপির কঠোর অবস্থান। দলটি অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টিকে তাদের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হিসেবেও গ্রহণ করেছিল।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বারবার এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন যে, অবৈধ বাংলাদেশিদের অনুপ্রবেশের ফলে মালদা ও মুর্শিদাবাদের মতো সীমান্ত জেলাগুলোর জনবিন্যাসে পরিবর্তন আসছে। মোদি মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশকারীদের রাজ্যে প্রবেশের সুযোগ দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগও এনেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারণায় ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছিলেন এবং তাঁর জনসভাগুলোর মূল আলোচ্য বিষয় হিসেবে অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গটিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী (পশ্চিমবঙ্গের ভাবী মুখ্যমন্ত্রী) বলেছেন যে, "রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের" প্রথমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে এবং পরবর্তীতে দেশ থেকে বহিষ্কার করতে হবে। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, "একজনও রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীকে" দেশে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে না।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী শর্মাও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন এবং অসমের মতোই এখানেও অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করেছিলেন।
এখন, অসম ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর এবং বৃহস্পতিবার অনুপ্রবেশ ও "ভারত থেকে অবৈধ বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসন" বিষয়ে ভারতের অবস্থান আরও কঠোর করার ফলে, বাংলাদেশ সম্ভাব্য "জোর করে ফেরত পাঠানোর" আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।
যদিও যারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছে, তাদের ফেরত পাঠানোর পূর্ণ অধিকার ভারতের রয়েছে। তবুও একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উচিত এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা এবং অহেতুক ভীতি বা শঙ্কা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকা।















