আজকাল ওয়েবডেস্ক: তিনি শুধু জানতে চেয়েছিলেন ক’টা বাজে। সারাদিন মঙ্গোলপুরীর কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে তখন পীতমপুরার বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছিলেন ৩০ বছর বয়সী এক মহিলা। রাত হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সাধারণ এক শ্রমজীবী মানুষের মতো তিনিও ভরসা করেছিলেন শহরের রাজপথ আর গণপরিবহনের ওপর। সরস্বতী বিহারের বি-ব্লকের কাছে একটি স্লিপার বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে গিয়ে সহজ মনে সময়টা জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি। কে জানত, ঘড়ির কাঁটার সেই খোঁজ নিতে যাওয়াই তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।
দিল্লি পুলিশ সূত্রে যে খবর সামনে আসছে, তা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। অভিযোগ, সময় বলার অছিলায় ওই মহিলাকে জোর করে টেনে বাসের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে দিল্লির রানী বাগ এলাকার প্রায় ৭ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে চলন্ত বাসে তাঁর ওপর নারকীয় নির্যাতন চালানো হয়। বাসের চালক এবং কন্ডাক্টর—দুজন মিলে তাঁকে গণধর্ষণ করে। যখন গোটা শহর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন এক জনবহুল রাস্তার ওপর দিয়ে ঘাতক বাসটি ক্রমাগত চক্কর কাটছিল আর ভেতরে চলছিল পাশবিকতা। ওই মহিলা কেবল একজন শ্রমিক নন, তিনি কারোর স্ত্রী, তিন সন্তানের জননী। প্রতিদিনের মতো সেদিনও কাজ শেষে পরিবারের কাছে ফেরার তাড়া ছিল তাঁর।
বৃহস্পতিবার পুলিশ ওই দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করার পরই রাজধানী জুড়ে কান্নার রোল আর ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার ভয়াবহতা মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০১২ সালের সেই অভিশপ্ত ডিসেম্বরকে। দিল্লির মানুষ আজও ভুলতে পারেনি ফিজিওথেরাপি ছাত্রীর সেই যন্ত্রণার কথা, যাকে আমরা ‘নির্ভয়া’ নামে চিনি। সেদিনও একটি বেসরকারি বাস ছিল, ছিল রাতের রাস্তা আর একদল পিশাচ। নির্ভয়া কাণ্ডের পর দেশ উত্তাল হয়েছিল, ইন্ডিয়া গেটে মানুষের ঢল নেমেছিল, সংসদ কেঁপে উঠেছিল। বদলে গিয়েছিল আইন, গঠিত হয়েছিল বিশেষ তহবিল, তৈরি হয়েছিল ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট। সবাই কথা দিয়েছিল—আর কখনও এমনটা ঘটবে না।
কিন্তু আজ ১৪ বছর পর, ২০২৬ সালের ১৪ মে দাঁড়িয়ে সেই একই দিল্লির বুকে প্রায় হুবহু একই গল্পের পুনরাবৃত্তি দেখা গেল। সেই একই বেসরকারি বাস, একই নির্জন রাত আর সেই বাসেরই চালক-কন্ডাক্টর যাদের ওপর যাত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকার কথা। দিল্লির রাজনীতিতে এখন এই নিয়ে শোরগোল চরমে। আম আদমি পার্টির নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ থেকে শুরু করে মণীশ সিসোদিয়া—প্রত্যেকেই দিল্লির নারী নিরাপত্তা নিয়ে সরব হয়েছেন। রাজনৈতিক রং সরিয়ে রেখে সাধারণ মানুষও আজ এক সুরে বলছেন, দিল্লির রাস্তায় মেয়েরা কি আদৌ কোনওদিন নিরাপদ হবে?
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও একটি সাহসী আলোর গল্প শুনিয়েছেন নির্যাতিতা ওই মহিলা। সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবার বা বস্তি এলাকার শ্রমজীবী মহিলারা অনেক সময়ই পুলিশের কাছে যেতে ভয় পান—পাছে তাঁদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, পাছে প্রতিবেশী বা সমাজ তাঁদেরই দোষারোপ করে। কিন্তু এই মহিলা দমে যাননি। ১২ মে তিনি রানী বাগ থানায় গিয়ে সবটা খুলে বলেন। নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) আইনের আওতায় মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বাসটিকে বাজেয়াপ্ত করেছে এবং বৃহস্পতিবার ভোরের মধ্যেই দুই অভিযুক্তকে শ্রীঘরে পাঠিয়েছে।
আইন বলছে, গণধর্ষণের ক্ষেত্রে এখন সর্বনিম্ন সাজা ২০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। নির্ভয়া কাণ্ডের পর বাসে জিপিএস ট্র্যাকিং, সিসিটিভি ক্যামেরা, চালক-কন্ডাক্টরের পুলিশ ভেরিফিকেশন—সবই বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কিন্তু সরস্বতী বিহারের বাসস্ট্যান্ডে সেদিন কি সিসিটিভি কাজ করছিল? জিপিএস ট্র্যাকিং কি সেই দুই ঘণ্টা ধরে অস্বাভাবিক রুটে ঘোরাফেরা করা বাসটির সংকেত দিতে পারেনি? কড়া আইন আসলে কাগজের পাতায় সাজানো থেকে যাচ্ছে, আর রাজপথে অসহায় হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন।
এই লড়াইয়ে নির্যাতিতা বেঁচে আছেন, এটাই একমাত্র স্বস্তির খবর। তিনি তাঁর অভিযোগ দায়ের করেছেন, অপরাধীদের চিহ্নিত করেছেন। এখন প্রশ্ন শুধু একটাই—আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা আর তারিখের পর তারিখ কি তাঁকে ক্লান্ত করে দেবে? নাকি এবার অন্তত দ্রুত বিচার দেখে শহরটা একটু শান্ত হতে পারবে? ২০১২ সালে দিল্লির ক্ষোভ যে আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা কেন ২০২৬-এর মে মাসে এক জননীকে নিরাপত্তা দিতে পারল না? যে নারী কেবল বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন, যিনি শুধু জানতে চেয়েছিলেন সময় কত—তাঁর কাছে দিল্লির সময় আজ যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। শহরটা কি আদৌ লজ্জিত? নাকি ৪৮ ঘণ্টার নিউজ সাইকেল শেষ হলেই আমরা আবার সব ভুলে যাব?















