আজকাল ওয়েবডেস্ক: অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫–২৬ ভারতীয় কৃষি ব্যবস্থার এক বাস্তববাদী, কিন্তু উদ্বেগজনক ছবি তুলে ধরেছে। মাঝে-মধ্যে খরা, অতিবৃষ্টি বা মহামারির ধাক্কা সামলেও কৃষি খাত যে এখনও দেশের অর্থনীতির ‘গ্রোথ ইঞ্জিন’ হয়ে উঠতে পারেনি, তা স্পষ্ট করে বলছে সমীক্ষা। বরং কাঠামোগত অদক্ষতা, উৎপাদন ঘাটতি, আঞ্চলিক বৈষম্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ কৃষিকে দীর্ঘমেয়াদে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে—যার প্রভাব পড়ছে কৃষকের আয় ও খাদ্য নিরাপত্তা—দুটির উপরই।
গ্রামীণ আয়ের অন্যতম ভরসা হিসেবে যে দুগ্ধ খাতকে দেখা হয়, সেখানেও সংকট গভীর হচ্ছে। সমীক্ষা জানাচ্ছে, পশুখাদ্য ও ফডারের ঘাটতি এখন ‘সংকটজনক’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কনসেন্ট্রেট খাদ্যের ক্ষেত্রে চাহিদা ও জোগানের ফারাক ২৮ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গবাদি পশুর উৎপাদনশীলতা ও দুধের ফলনে।
সমীক্ষার অন্যতম প্রধান পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় ভারতের শস্য উৎপাদন এখনও অনেক পিছিয়ে। ডাল, খাদ্যশস্য, ভুট্টা, সয়াবিন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই হেক্টরপ্রতি উৎপাদন আন্তর্জাতিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শুধু আন্তর্জাতিক নয়, দেশের ভেতরেও উৎপাদনের তীব্র বৈষম্য চোখে পড়ছে। একাধিক প্রধান ধান উৎপাদনকারী রাজ্যে ফলন জাতীয় গড়ের নিচে নেমে গেছে। এর পিছনে রয়েছে অনিয়মিত বৃষ্টি, চরম তাপপ্রবাহ এবং ফসলের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দীর্ঘ শুষ্ক সময়—যা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
ডালশস্য চাষের অবস্থা সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করেছে সমীক্ষা। গত ২৭টি এল নিনো বছরের মধ্যে ১৫ বছরেই ডাল চাষের জমি ও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কোথাও কোথাও ফলন কমেছে ৫ শতাংশ থেকে শুরু করে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। এই অনিশ্চয়তার ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ভরসাযোগ্য থাকছে না, বাড়ছে আমদানির উপর নির্ভরতা এবং ভোক্তাদের জন্য তৈরি হচ্ছে দামের অস্থিরতা।
ইনপুট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুরুতর ভারসাম্যহীনতার কথা তুলে ধরেছে সমীক্ষা। ভারতের সার ব্যবহারের ধরন ক্রমশ বিকৃত হয়ে পড়েছে। ২০২৩–২৪ সালে নাইট্রোজেন-ফসফরাস-পটাশ (N:P:K) অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১০.৯:৪.১:১—যেখানে সুপারিশকৃত অনুপাত ৪:২:১। এই অসামঞ্জস্যের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ইউরিয়া-নির্ভর ভর্তুকি কাঠামোকে। এর ফল ইতিমধ্যেই মাটির জৈব পদার্থ কমছে, ভূগর্ভস্থ জলে নাইট্রেট দূষণ বাড়ছে এবং সারের প্রতি ফসলের প্রতিক্রিয়া ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
কৃষির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলিও একইভাবে রয়ে গেছে। জমির অতিরিক্ত খণ্ডীকরণ, কম পুঁজি বিনিয়োগ ও সীমিত যান্ত্রিকীকরণ কৃষিকে এগোতে দিচ্ছে না। সেচ ব্যবস্থায়ও তীব্র বৈষম্য স্পষ্ট—যেখানে ধান চাষের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমি সেচের আওতায়, সেখানে মিলেট বা শস্যজাত ফসলের ক্ষেত্রে এই হার ১৫ শতাংশেরও কম। আর্থিক চাপও বাড়ছে। কৃষি খাতে ব্যাঙ্ক ঋণের অনাদায়ী সম্পদের (NPA) হার এখনও প্রায় ৬ শতাংশ, এবং ২০২৫ সালে মোট ব্যাঙ্কিং এনপিএ-তে কৃষির অংশ আরও বেড়েছে।
গ্রামের সাধারণ সম্পদের অবক্ষয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চরাগাহ, পুকুর ও কমন জমির দখলদারি এবং অবনতি এখন দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ ভূখণ্ডকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রার সহায়ক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।
নীতিগত সিদ্ধান্তগুলিও সমস্যাকে অনেক ক্ষেত্রে বাড়িয়েছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে সমীক্ষা। ভুট্টা-ভিত্তিক ইথানলের প্রশাসনিক মূল্য নির্ধারণ ভুট্টা চাষকে উৎসাহিত করলেও ডাল ও তেলবীজের জমি কমিয়েছে—যা পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকে উদ্বেগজনক। পাশাপাশি, ঘন ঘন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা, ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য আরোপের মতো সিদ্ধান্ত সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সব মিলিয়ে, অর্থনৈতিক সমীক্ষার মূল্যায়ন স্পষ্ট—ভারতীয় কৃষি এখনও একটি ‘লো-এফিশিয়েন্সি ইকুইলিব্রিয়াম’-এ আটকে রয়েছে। ইনপুটের অতিরিক্ত ব্যবহার ও ভাঙা ভাঙা নীতিগত হস্তক্ষেপ থেকে বেরিয়ে এসে যদি উৎপাদনশীলতা-কেন্দ্রিক, সমন্বিত সংস্কারের পথে না হাঁটা যায়, তবে কৃষি খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলি কমার বদলে আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
