আজকাল ওয়েবডেস্ক: দিল্লি দাঙ্গা সংক্রান্ত ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার (৫ জানুয়ারি) শীর্ষ আদালত ইউএপিএ (Unlawful Activities Prevention Act, 1967) মামলায় অভিযুক্ত উমর খালিদ ও শরজিল ইমামের জামিনের আবেদন খারিজ করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মামলার নথি ও প্রমাণ থেকে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে গুরুতর অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছে।

তবে একই সঙ্গে এই মামলায় অভিযুক্ত আরও কয়েকজন গুলফিশা ফাতিমা, মীরা হায়দার, শিফা উর রহমান, মহম্মদ সেলিম খান ও শাদাব আহমেদ-এর জামিন মঞ্জুর করেছে আদালত।

বিচারপতি অরবিন্দ কুমার ও বিচারপতি এন. ভি. অঞ্জারিয়া-র বেঞ্চ জানিয়েছে, উমর খালিদ ও শরজিল ইমামের ক্ষেত্রে অভিযোগ কেবল বিচ্ছিন্ন বা স্থানীয় ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আদালতের ভাষায়, তাঁদের ভূমিকা ছিল “কেন্দ্রীয় ও গঠনমূলক” এবং দাঙ্গার পরিকল্পনা, সংগঠিত করা  ও কৌশলগত দিকনির্দেশনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

রায়ে বলা হয়েছে, ইউএপিএ-র ধারা ৪৩ডি(৫)-এর কঠোর শর্ত এই দুই অভিযুক্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আদালতের মতে, তাঁদের দীর্ঘদিনের আটক এখনও সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করেনি, ফলে জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা কাটেনি।

তবে আদালত জানিয়েছে, উমর খালিদ ও শরজিল ইমাম বাকি সুরক্ষিত সাক্ষীদের (Protected Witnesses)  জেরা শেষ হওয়ার পর অথবা আজ থেকে এক বছর পরে নতুন করে জামিনের আবেদন করতে পারবেন।

আদালত স্পষ্ট করেছে, সব অভিযুক্তকে এক চোখে দেখা হয়নি। প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদা করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যাঁদের জামিন দেওয়া হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে আদালতের মতে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের মাত্রা ইউএপিএ-র কঠোর সীমা অতিক্রম করেনি।

জামিনপ্রাপ্ত অভিযুক্তদের জন্য মোট ১২টি কড়া শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কোনও শর্ত ভঙ্গ হলে জামিন বাতিল করা হবে বলেও জানিয়েছে আদালত। পাশাপাশি ট্রায়াল কোর্টকে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার সময় বিচারপতি অরবিন্দ কুমার বলেন, ইউএপিএ মামলায় বিচার দেরি হওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিযুক্তদের জামিন পাওয়ার অধিকার তৈরি করে না। তবে একই সঙ্গে আদালত এটাও স্পষ্ট করেছে যে, ইউএপিএ-র ধারা ৪৩ডি(৫) বিচারিক পর্যালোচনাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে না।

আদালতের মতে, বিচারকের দায়িত্ব হল প্রসিকিউশনের নথি যদি সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা তৈরি করে কি না, তা নির্ধারণ করা। এই বিচারিক অনুসন্ধান অবশ্যই অভিযুক্ত-নির্দিষ্ট হবে।

এছাড়া আদালত ব্যাখ্যা করেছে, ইউএপিএ-র ধারা ১৫ (সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ) কেবলমাত্র প্রত্যক্ষ হিংসাত্মক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জনজীবন ব্যাহত করা, পরিষেবা ধ্বংস বা অর্থনীতির উপর গুরুতর প্রভাব ফেলাও এই ধারার আওতায় পড়তে পারে।

এই মামলায় অভিযুক্তরা ২০১৯-২০ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)-বিরোধী আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দিল্লির উত্তর-পূর্ব অংশে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পিছনে একটি ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ রচনা করার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ ও ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে।

উমর খালিদ ও শরজিল ইমাম-সহ একাধিক অভিযুক্ত ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর দিল্লি হাই কোর্টের জামিন নাকচের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন। তাঁরা প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিচারাধীন অবস্থায় কারাবন্দি।

এই মামলায় উমর খালিদের পক্ষে ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল, শরজিল ইমামের পক্ষে সিদ্ধার্থ দাভে, গুলফিশা ফাতিমার পক্ষে অভিষেক মনু সিংভি, শিফা উর রহমানের পক্ষে সলমন খুরশিদ-সহ একাধিক সিনিয়র আইনজীবী। দিল্লি পুলিশের পক্ষে সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতা ও অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল এস. ভি. রাজু সওয়াল করেন।

এই রায় নতুন করে ইউএপিএ, প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদের আইনি সীমা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ককে আরও তীব্র করবে বলেই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।