আজকাল ওয়েবডেস্ক: মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর শহরের ভাগীরথপুরা এলাকায় পানীয় জলে নিকাশির জল মিশে গিয়ে ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) পর্যন্ত এই ঘটনায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন। মৃতদের মধ্যে ছয় মাসের এক শিশু ও ছয়জন মহিলা রয়েছেন। গত এক সপ্তাহে দূষিত জল পান করার ফলে শতাধিক মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে, আর মোট অসুস্থের সংখ্যা ছাড়িয়েছে দুই হাজার।
স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় ৭,৯৯২টি বাড়িতে সমীক্ষা চালিয়ে প্রায় ৩৯,৮৫৪ জনকে পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২,৪৫৬ জনের মধ্যে বমি ও ডায়রিয়ার উপসর্গ ধরা পড়ে, যাদের অনেককেই বাড়িতেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২১২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে ৫০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও এখনও ১৬২ জন চিকিৎসাধীন, যাদের মধ্যে ২৬ জনের অবস্থা গুরুতর এবং তারা আইসিইউ-তে রয়েছেন।
যদিও সরকারি মহল প্রথমে মৃত্যুসংখ্যা নিয়ে অস্পষ্ট অবস্থান নেয়, মেয়র পুষ্যমিত্র ভার্গব একদিন আগে সাতজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেন। স্বাস্থ্য দপ্তরের রিপোর্টে প্রথমে তিনজনের মৃত্যুর উল্লেখ থাকায় তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, একটি শৌচাগার সরাসরি প্রধান পানীয় জল সরবরাহ লাইনের ওপর নির্মিত ছিল। ওই শৌচাগারের নিকাশির পাইপ থেকে লিক হয়ে মলমূত্রযুক্ত জল পানীয় জলের লাইনে মিশে যায়। নগর কমিশনার দিলীপ যাদব জানিয়েছেন, ওই শৌচাগার ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং একাধিক লিকেজ মেরামত করা হয়েছে। জল সরবরাহ পুনরায় চালু করার আগে সম্পূর্ণ পরীক্ষা করা হবে বলে তিনি জানান।
নথি অনুযায়ী, ভাগীরথপুরা এলাকায় নতুন জল সরবরাহ লাইনের জন্য চলতি বছরের আগস্টে পুরসভা টেন্ডার জারি করলেও তা মাসের পর মাস খোলা হয়নি। AMRUT প্রকল্পের অর্থ না পাওয়ায় কাজ শুরু হয়নি, অথচ প্রশাসন বিষয়টি জেনেও দূষিত জল সরবরাহ চালু রেখেছিল যা শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী পরিণতি ডেকে আনে।
ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব পিএইচই দপ্তরের ইন-চার্জ সাব-ইঞ্জিনিয়ার শুভম শ্রীবাস্তবকে বরখাস্ত করেন এবং জোনাল অফিসার শালিগ্রাম সিতোলে ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার যোগেশ যোশীকে সাসপেন্ড করা হয়। পাশাপাশি আইএএস আধিকারিক নবজীবন পানওয়ারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা টেন্ডার বাস্তবায়নে বিলম্ব-সহ গোটা ঘটনার দায় নির্ধারণ করবে।
নগর উন্নয়নমন্ত্রী ও ইন্দোর-১ বিধায়ক কৈলাশ বিজয়বর্গীয় ঘটনাটিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে স্বীকার করলেও বলেন, আপাতত চিকিৎসাই অগ্রাধিকার। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন, যার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। পরে তিনি বিবৃতি দিয়ে বলেন, টানা দু’দিন না ঘুমিয়ে কাজ করার মানসিক চাপে তার কথাবার্তা ভুলভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
এই ঘটনার জেরে রাজ্যের রাজনীতিও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে যে প্রকৃত মৃত্যুসংখ্যা চাপা দেওয়া হচ্ছে। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি জিতেন্দ্র পাটওয়ারি বিজেপিকে আক্রমণ করে বলেন, একচেটিয়া ক্ষমতায় বসে থাকা দল মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। রাজ্য কংগ্রেস একটি পাঁচ সদস্যের তথ্য অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে, যারা ৫ জানুয়ারির মধ্যে রিপোর্ট জমা দেবে।
এরই মধ্যে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে নোটিশ দিয়ে ২ জানুয়ারির মধ্যে স্ট্যাটাস রিপোর্ট তলব করেছে এবং নির্দেশ দিয়েছে সব রোগীর বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে। বেসরকারি হাসপাতালগুলির টাকা না দিলে চিকিৎসা না করার অভিযোগও আদালতের নজরে এসেছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবিও বিবেচনাধীন রয়েছে।
টানা আট বছর ধরে ‘ভারতের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর’-এর তকমা পাওয়া ইন্দোরে এই ঘটনা দেখিয়ে দিল, পুরস্কার আর বাস্তব নাগরিক নিরাপত্তার মধ্যে ফারাক কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
