আজকাল ওয়েবডেস্ক: বৃহস্পতিবার প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫–২৬ প্রায় দু’দশক পুরনো তথ্যের অধিকার আইন (RTI Act), ২০০৫ নতুন করে খতিয়ে দেখার পক্ষে সওয়াল করেছে। সমীক্ষার মতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মূল চেতনা অক্ষুণ্ণ রেখেই প্রশাসনিক কাজকর্মে অপ্রয়োজনীয় চাপ কমাতে কিছু নির্দিষ্ট নথি ও অভ্যন্তরীণ আলোচনা প্রকাশের বাইরে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার।

সমীক্ষা স্পষ্ট করেছে, আরটিআই আইন প্রণীত হয়েছিল স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য। তবে এই আইনকে কখনওই ‘অকারণ কৌতূহল মেটানোর হাতিয়ার’ বা সরকারের দৈনন্দিন কাজকর্ম বাইরের দিক থেকে সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় হিসেবে কল্পনা করা হয়নি।

প্রায় ২০ বছর পেরিয়ে এসে আইনটির পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে সমীক্ষা জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য আইনকে দুর্বল করা নয়, বরং আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা এবং তার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত রাখা। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি জোরদার করা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের প্রভাবিত করা সিদ্ধান্তগুলির ব্যাখ্যা দাবি করার অধিকার—এই মূল লক্ষ্য অটুট রাখার কথাই বলা হয়েছে।

তবে সমীক্ষার সতর্কবার্তা, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও খসড়া পর্যায়ের নথি অতিরিক্তভাবে প্রকাশিত হলে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যাহত হতে পারে। নীতিনির্ধারণের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা চিন্তাভাবনা, অর্ধসমাপ্ত মতামত বা ‘ব্রেনস্টর্মিং’ নোট প্রকাশ্যে এলে প্রশাসনিক সাহস ও উদ্ভাবনী চিন্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই প্রেক্ষিতে, আলোচনার জন্য কয়েকটি সম্ভাব্য পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছে সমীক্ষা। এর মধ্যে রয়েছে—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ব্রেনস্টর্মিং নোট, ওয়ার্কিং পেপার ও খসড়া মন্তব্যগুলিকে তথ্য প্রকাশের বাইরে রাখা। পাশাপাশি, সরকারি কর্মীদের সার্ভিস রেকর্ড, বদলি সংক্রান্ত নথি এবং গোপন মূল্যায়ন রিপোর্ট নিয়মিত আরটিআইয়ের আওতায় আনা আদৌ জনস্বার্থে কতটা প্রয়োজনীয়, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সমীক্ষা।

আরও একটি প্রস্তাব হিসেবে উঠে এসেছে সীমিত পরিসরের মন্ত্রিসভা বা মন্ত্রীস্তরের ভেটো ক্ষমতার বিষয়টি—যা সংসদীয় নজরদারির আওতায় থাকবে এবং শুধুমাত্র তখনই প্রয়োগ করা হবে, যখন কোনও তথ্য প্রকাশ প্রশাসনিক কার্যকারিতাকে গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
সমীক্ষা জোর দিয়ে জানিয়েছে, এগুলি কোনও চূড়ান্ত সুপারিশ নয়, বরং বিতর্ক ও আলোচনার জন্য তোলা প্রস্তাব। লক্ষ্য একটাই—আইন যেন কার্যকর থাকে, আবার একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও অখণ্ডতাও বজায় থাকে।

স্বচ্ছতা ও কার্যকর শাসনের মধ্যে ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষ জোর দিয়েছে অর্থনৈতিক সমীক্ষা। সেখানে বলা হয়েছে, যদি সরকারি আধিকারিকদের মনে হয় যে তাঁদের প্রতিটি খসড়া মন্তব্য বা প্রাথমিক চিন্তা ভবিষ্যতে প্রকাশ্যে আসতে পারে, তাহলে তাঁরা সাবধানী ও নিরাপদ ভাষার আশ্রয় নেবেন। এর ফলে সাহসী সিদ্ধান্ত ও নতুন চিন্তার জায়গা সংকুচিত হতে পারে।

তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—এটি ‘স্বাভাবিক গোপনীয়তা’র পক্ষে যুক্তি নয়। গণতন্ত্র সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করে তখনই, যখন আধিকারিকরা স্বাধীনভাবে আলোচনা করতে পারেন এবং শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তে পৌঁছন, তার জন্য জনসমক্ষে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন—প্রাথমিক চিন্তার জন্য নয়।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে সমীক্ষা জানিয়েছে, নাগরিকের জানার অধিকার কোনওভাবেই কেবল ভারতের ধারণা নয়। ১৭৬৬ সালে সুইডেন প্রথম তথ্যের স্বাধীনতা আইন চালু করে। পরে যুক্তরাষ্ট্র (১৯৬৬) এবং যুক্তরাজ্য (২০০০) এই পথে হাঁটে। যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার নিজেই পরে এই আইন প্রবর্তনের জন্য আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন, যুক্তি দিয়েছিলেন—গোপন ও খোলামেলা আলোচনা কার্যকর শাসনের জন্য অপরিহার্য।

যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের জাস্টিস কমিটিও অভ্যন্তরীণ নীতিগত আলোচনাকে সুরক্ষিত রাখতে ছাড়ের পরিধি বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। আন্তর্জাতিক তুলনায় ভারতের আরটিআই ব্যবস্থা অনেক বেশি বিস্তৃত বলেও উল্লেখ করেছে সমীক্ষা। সুইডেনে রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং নজরদারি কার্যকলাপ সুরক্ষিত। যুক্তরাজ্যে নীতি প্রণয়ন সংক্রান্ত নথি ছাড় পায় এবং জনস্বার্থে মন্ত্রীদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। এমনকি বিশ্ব ব্যাঙ্কও আলোচনামূলক নথি প্রকাশ করে না।

এর বিপরীতে, ভারতে খসড়া নোট, অভ্যন্তরীণ চিঠিপত্র এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি আধিকারিকদের ব্যক্তিগত নথিও প্রকাশ্যে চলে আসে—যার সঙ্গে জনস্বার্থের যোগসূত্র অনেক সময়ই দুর্বল বলে মত সমীক্ষার। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশে যেখানে ‘ডেলিবারেটিভ প্রসেস’-এর জন্য সাধারণ ছাড় রয়েছে, ভারতে সেখানে শুধু মন্ত্রিসভার নথিই সাময়িক সুরক্ষা পায়।

সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক সমীক্ষার বক্তব্য, চ্যালেঞ্জ একটাই—স্বচ্ছতা বজায় রেখেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় খোলামেলা আলোচনার জায়গা অক্ষুণ্ণ রাখা। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করাই আরটিআই আইনকে তার গণতান্ত্রিক উদ্দেশ্যের প্রতি সত্যনিষ্ঠ রাখার একমাত্র পথ।