আজকাল ওয়েবডেস্ক: সাম্প্রতিক সময়ে একটি জনপ্রিয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ইন্ডিয়া টুডে-তে প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল “ভারতের মিষ্টির রাজধানী কোন শহর?” এবং সেখানে নিঃসন্দেহে কলকাতাকেই সেই মুকুট পরানো হয়। তবে এই বহুল প্রচলিত ধারণা নিয়ে এবার পাল্টা প্রশ্ন তুলছে এক বিশ্লেষণধর্মী লেখা, যেখানে বলা হচ্ছে কলকাতার মিষ্টির ঐতিহ্য যতটা রোমান্টিক, বাস্তবের নিরিখে ততটাই সীমাবদ্ধ।
উত্তর কলকাতার গলিপথে হাঁটলে আজও দুধ জ্বাল দেওয়ার গন্ধ, কাঁসার হাঁড়ির শব্দ আর শতাব্দী প্রাচীন মিষ্টির দোকানের স্মৃতিমাখা পরিবেশ মন ছুঁয়ে যায়। সন্দেশ, রসগোল্লা, রসমালাই এই নামগুলোই যেন শহরের পরিচয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই পরিচয় কি বৈচিত্র্যের দিক থেকে যথেষ্ট?
এই তুলনায় সামনে আনা হচ্ছে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার দূরের রাজস্থানের মরু শহর বিকানেরকে। সেখানে মিষ্টির ঘ্রাণে নেই নরম দুধের বাষ্প, আছে গরম ঘি, ভাজা বেসন আর শুষ্ক আবহাওয়ায় টিকে থাকার ইতিহাস। হালদিরাম, বিকাজি, বিকানেরওয়ালা এই নামগুলো আজ শুধু ভারতের নয়, আন্তর্জাতিক খাদ্য বাজারেরও পরিচিত ব্র্যান্ড।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কলকাতাকে ‘মিষ্টির রাজধানী’ বলার পেছনে মূলত একটি উপাদানের আধিপত্য কাজ করে ছানার। ১৮৬৮ সালে নবীনচন্দ্র দাস রসগোল্লার যে নতুন রূপ দিয়েছিলেন, তা নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, তারপর থেকে বাংলার মিষ্টি জগত সেই ছানার পরিসরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। সন্দেশ হোক বা রসমালাই উপাদান ও গঠনের দিক থেকে বৈচিত্র্য সীমিত, সংরক্ষণ ক্ষমতাও অল্প।
অন্যদিকে বিকানেরের মিষ্টি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে কঠিন ভৌগোলিক বাস্তবতার মধ্যে। থর মরুভূমির তীব্র গরম ও শীতে টিকে থাকতে প্রয়োজন ছিল অতিরিক্ত ক্যালোরি, দীর্ঘস্থায়ী খাবারের। সেই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয় ঘি, গুড়, বেসন, মুগ ডাল, গম ও চালভিত্তিক অসংখ্য মিষ্টান্ন। গোঁদ পাক, ঘেওয়ার, ফিনি, লাপসি এই সব মিষ্টি শুধু স্বাদের জন্য নয়, শরীরকে শক্তি জোগানোর জন্যও তৈরি।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে গোঁদ পাকের কথা যা ঘি, গমের আটা, ভোজ্য গোঁদ ও শুকনো ফল দিয়ে তৈরি এক ধরনের পুষ্টিকর শীতকালীন মিষ্টি। তুলনায় রসগোল্লাকে বলা হয়েছে ‘চিনির জলে ভেজানো ক্ষণস্থায়ী আনন্দ’, যা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
এছাড়া বিকানেরের মিষ্টি ও নোনতা খাবারের সংযোগও আলাদা করে তুলে ধরা হয়েছে। ১৮৭৭ সালে রাজকীয় উদ্যোগে তৈরি বিকানেরি ভুজিয়া শুধু একটি স্ন্যাকস নয়, বরং ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতিতে এক নতুন অধ্যায়। মরু অঞ্চলে জন্মানো মোথ ডাল ব্যবহার করে তৈরি এই ভুজিয়া আজ বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, প্রবাসী ভারতীয়দের কাছে ‘ভারতীয় মিষ্টি’ বলতে আজ কলকাতার দোকানের নাম নয়, বরং হালদিরাম বা বিকাজির প্যাকেটই বেশি পরিচিত। বিকানেরের ব্যবসায়ীরা ঐতিহ্যকে শুধু ধরে রাখেননি, প্রযুক্তি ও প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে তাকে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
লেখাটির মূল বক্তব্যে বলা হয়েছে, পার্থক্যটা আসলে মানসিকতার। কলকাতার মিষ্টিকাররা নিজেদের ঐতিহ্যের রক্ষক হিসেবে দেখেছেন, স্থানীয় চাহিদায় সন্তুষ্ট থেকেছেন। আর বিকানেরের ব্যবসায়ীরা সেই ঐতিহ্যকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন, বিশ্বকে লক্ষ্য করে এগিয়েছেন।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে কলকাতা কি শুধুই ছানার শহর, আর বিকানের কি আসল ‘মিষ্টি সাম্রাজ্যের’ নির্মাতা? উত্তর যাই হোক, এই বিতর্ক আবারও ভারতের খাদ্য সংস্কৃতির বৈচিত্র্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
