আজকাল ওয়েবডেস্ক: শহরের আকাশে উড়ে বেড়ানো পায়রা আমাদের কাছে খুবই পরিচিত দৃশ্য। রেলস্টেশন, পার্ক, বাজার, পুরনো ভবন কিংবা উঁচু অট্টালিকার কার্নিশ—প্রায় সর্বত্রই দেখা মেলে এই পাখির। অনেকেই মনে করেন, শহুরে পায়রা আধুনিক নগরজীবনের অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে, মানুষের সঙ্গে শহুরে পায়রাদের সহাবস্থানের ইতিহাস আজকের নয়, প্রায় ৩,৫০০ বছর পুরোনো।
গবেষকদের মতে, বর্তমানে শহরে যে রক পিজন বা ফেরাল পিজন দেখা যায়, তাদের পূর্বপুরুষ মূলত পাহাড়ি ও পাথুরে অঞ্চলে বাস করত। প্রাচীন সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যখন বড় বড় নগর, দুর্গ ও স্থাপনা নির্মাণ শুরু করে, তখন সেই ভবনগুলিই পাথুরে পাহাড়ের মতো নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে তাদের আকৃষ্ট করে। ধীরে ধীরে মানুষের বসতির কাছাকাছি তাদের স্থায়ী বসবাস শুরু হয়।
বিজ্ঞানীরা প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক দলিল এবং আধুনিক জিনগত বিশ্লেষণ মিলিয়ে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তাদের মতে, ব্রোঞ্জ যুগ থেকেই মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নগরগুলিতে কবুতরের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর বাণিজ্য, যুদ্ধ এবং মানব অভিবাসনের মাধ্যমে এই পাখি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাচীনকালে পায়রাদের গুরুত্ব ছিল বহুমুখী। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার আগে বার্তা আদান-প্রদানে হোমিং পিজন ব্যবহার করা হতো। এমনকি যুদ্ধের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে দিতে এদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এছাড়া অনেক অঞ্চলে খাদ্য ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও এদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল।
গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, শহুরে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। উঁচু দালান, সেতু, রেলস্টেশন কিংবা পুরনো ভবন—সবকিছুকেই তারা প্রাকৃতিক পাহাড়ি খাঁজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে। মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার, শস্য এবং অন্যান্য খাদ্য উৎস সহজলভ্য হওয়ায় শহর তাদের জন্য একটি আদর্শ বাসস্থান হয়ে উঠেছে।
তবে শহরে এদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছে। ভবনের ক্ষতি, মল এবং বিমানবন্দরের আশপাশে উড়ে বেড়ানোর কারণে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দেয়। তাই বিশ্বের অনেক শহর এখন মানবিক উপায়ে এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের সঙ্গে সহাবস্থানের টেকসই পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পায়রাকে শুধু "শহরের সাধারণ পাখি" হিসেবে দেখলে ভুল হবে। মানুষের ইতিহাস, নগর সভ্যতার বিকাশ এবং প্রাণীর অভিযোজন ক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে এই পাখির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের পাশে থেকে তারা প্রমাণ করেছে, পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা প্রকৃতির অন্যতম সফল প্রাণী।
নতুন এই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিদিন চোখের সামনে দেখা এই সাধারণ পাখির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মানব সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের এই সহযাত্রা শুধু মানুষ ও এদের সম্পর্কই নয়, বরং নগরায়ণ এবং জীববৈচিত্র্যের পারস্পরিক অভিযোজনের এক অসাধারণ উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
















