আজকাল ওয়েবডেস্ক: মণিপুরের উখরুল জেলায় অপহৃত ২১ জন তাংখুল নাগা যুবককে অবশেষে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বুধবার অপহরণের একদিন পর বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ভোরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম Morung Express–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজ্য সরকারের আধিকারিক এবং নাগা ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের নেতাদের মধ্যে আলোচনার পর এই মুক্তির পথ তৈরি হয়। মুক্তির পর তাদের লিটান থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে তারা নিজেদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হন।
পুলিশ সূত্রের দাবি, বুধবার (১১ মার্চ) দুপুরে উখরুল–ইম্ফল সড়কে তিনটি গাড়িতে করে যাওয়ার সময় উখরুল জেলার কুকি অধ্যুষিত শাংখাই গ্রামে কিছু সশস্ত্র ব্যক্তি ও গ্রামবাসীরা তাদের আটক করে। পরে তাদের অপহরণ করা হয়। ঘটনার পর উখরুলের তাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের শীর্ষ সংগঠন Tangkhul Naga Long অভিযোগ করে যে কুকি জঙ্গিরাই এই অপহরণের পিছনে রয়েছে। সংগঠনটি এটিকে “নাগাদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিত হিংসা” বলে আখ্যা দিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে দুই ঘণ্টার মধ্যে অপহৃতদের উদ্ধার করার দাবি জানায়।
তবে শাংখাই গ্রামের কুকি গ্রাম কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে ভিন্ন দাবি করে। তাদের বক্তব্য, সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল তাংখুল নাগাদের কিছু “স্বেচ্ছাসেবক”-এর হামলা থেকে। তাদের অভিযোগ, ওই দলটি থোয়াই কুকি গ্রামের কৃষকদের ওপর গুলি চালায়, কয়েকজন কুকিকে আটক করে এবং কয়েকটি কুঁড়েঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। আলাদা একটি ঘটনায় জল পাইপ মেরামত করতে যাওয়া দুই শ্রমিক গুলির মুখে নিখোঁজ হয়ে যান বলেও দাবি করা হয়েছে। এছাড়া একজন গ্রামবাসী পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয়রা উখরুল রোড অবরোধও করেন।
এই ঘটনার পর মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী Yumnam Khemchand Singh সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অপহরণকারীদের উদ্দেশে লিখেছেন, “উখরুল–ইম্ফল সড়কে সাধারণ মানুষকে আটক করে রাখার খবর পেয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের অবিলম্বে সব নাগরিককে নিরাপদ ও নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।” পাশাপাশি তিনি নাগরিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শান্তি বজায় রাখতে সহযোগিতার আবেদন করেন।
উল্লেখ্য, গত মাসেই লিটান সারেইখোং এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধ ঘিরে কুকি ও তাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই ঘটনায় উভয় পক্ষের ৩০টিরও বেশি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
এই উত্তেজনার মধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অস্থির। প্রায় এক বছর রাষ্ট্রপতি শাসনের পর সম্প্রতি বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার আবার গঠিত হয়েছে এবং মেইতেই সম্প্রদায়ের নেতা Yumnam Khemchand Singh-কে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখতে কুকি-জো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী Nemcha Kipgen এবং নাগা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি Losii Dikho-কে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয়।
তবে এই সমীকরণ খুব একটা কার্যকর হয়নি। কুকি-জো কাউন্সিল কিপগেনের নেতৃত্ব মানতে অস্বীকার করেছে এবং তার পদত্যাগ দাবি করেছে। ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে দিল্লির মণিপুর ভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তাকে শপথ নিতে হয়—যা রাজ্যের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
৫ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরও এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কিপগেন এখনও ইম্ফলে অফিস খোলেননি। তিনি মূলত কাংপোকপি জেলার বাড়ি বা জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সরকারি বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। এমনকি দিল্লি থেকে ফেরার সময় তিনি ইম্ফলের বদলে নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে নেমে সড়কপথে কাংপোকপি গিয়েছিলেন, কারণ ওই পথটি মেইতেই অধ্যুষিত এলাকার মধ্য দিয়ে যায় না।
অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী সিংহও এখনও কুকি-জো অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকায় যাননি। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি চুরাচাঁদপুর জেলার সংঘর্ষপীড়িত কুকি-জো বাসিন্দাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে কথা বলেন। এই পরিস্থিতিতে উখরুলের অপহরণ ও মুক্তির ঘটনাকে অনেকেই মণিপুরের জটিল জাতিগত উত্তেজনার আরেকটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
