কখনও তীব্র গরম, তো কখনও আবার ভাদ্র মাসের মতো ভ্যাপসা আবহাওয়া। আবার বর্ষার মরশুমেও বৃষ্টির দেখা নেই, অথচ অন্য প্রান্তে চলছে তুমুল বন্যা। বিশ্বের আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনা দেখে অনেকেরই প্রশ্ন, হচ্ছেটা কী?
2
12
আবহাওয়াবিদদের মুখে এখন একটাই শব্দ- 'এল নিনো'।কিন্তু অনেকেই হয়তো ভাবছেন, এটি হয়তো নতুন কোনও ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপ! একদমই তা নয়। এল নিনো কোনও ঝড়-ঝাপটা বা সাইক্লোন নয়। তবে আবহাওয়াকে উলটেপালটে দেওয়ার ক্ষমতা এর রয়েছে বটে। তাহলে ঠিক কী এই এল নিনো? আর এর কোপে কীভাবে বদলে যায় পৃথিবীর আবহাওয়া?
3
12
সহজ ভাষায় বললে, এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটা বেড়ে যাওয়া। এর ফলে শুধু জলই গরম হয় না, বদলে যায় বাতাসের গতিপথ ও বৃষ্টির চেনা ছকও। যার জেরে পৃথিবীর এক প্রান্তে খরা দেখা দিলে, অন্য প্রান্তে মুষলধারে বৃষ্টি।
4
12
এর মূলে হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অংশ। স্বাভাবিক অবস্থায় এই অঞ্চলে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে বায়ু বা ট্রেড উইন্ড বয়ে যায়। সেই বাতাস সমুদ্রের উপরিভাগের উষ্ণ জলকে ঠেলে পশ্চিম দিকে সরিয়ে দেয়। এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশে গরম জল জমে থাকে। একইসঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছে সমুদ্রের গভীর থেকে ঠান্ডা জল উপরে উঠে আসে।
5
12
কিন্তু মাঝেমাঝেই এই স্বাভাবিক নিয়ম উলটে যায়। বাতাসের জোর কমে গেলে উষ্ণ জল আর পশ্চিম দিকে সরে যেতে পারে না। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের জল ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক গরম হয়ে ওঠে। সমুদ্রের এই বিশেষ উষ্ণ অবস্থাকেই বলা হয় ‘এল নিনো’।
6
12
স্প্যানিশ শব্দ ‘El Nino’-র অর্থ ‘ছোট ছেলে’ বা ‘দ্য বয়’। দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের জেলেরা বহু বছর আগে এই নাম দিয়েছিলেন। ক্রিসমাসের কাছাকাছি সময়ে এই উষ্ণ স্রোতের প্রভাব বেশি দেখা যেত বলে এর সঙ্গে যিশুখ্রিস্টের বাল্যকালের ধর্মীয় যোগও খুঁজে পেয়েছিলেন অনেকে। সেখান থেকেই এই নাম আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
7
12
ভারতের মতো কৃষিপ্রধান দেশের কাছে এল নিনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অতীতে বহুবার দেখা গিয়েছে, এল নিনো সক্রিয় থাকাকালীন ভারতে মৌসুমি বায়ু বা বর্ষার গতিপ্রকৃতির হেরফের হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে পানীয় জলের সরবরাহের উপর।
8
12
তবে বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো মানেই যে ভারতে বৃষ্টি হবে না- এমন কোনও সমীকরণ নেই। কারণ ভারতীয় বর্ষার সিস্টেমটি অত্যন্ত জটিল।
9
12
এল নিনোকে একেবারে ‘খারাপ’ তকমা দেওয়া ভুল। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এর প্রভাব ভিন্ন হয়। যেমন- কোনও এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে হয়তো খরা কাটল ও জলাধারগুলো জলে ভরে গেল, আবার অন্য কোথাও সেটাই ডেকে আনল বন্যা।
10
12
উল্লেখ্য, এল নিনোর একেবারে উলটো পিঠের অবস্থাকেও একটি নাম দেওয়া হয়েছে- ‘লা নিনা’। সেই সময় প্রশান্ত মহাসাগরের ওই একই অঞ্চলের জল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঠান্ডা হয়ে যায়।
11
12
এল নিনো এবং লা নিনা- এই দুই মিলেই তৈরি হয় বৃহত্তর জলবায়ু চক্র। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘এনসো’ ( El Nino–Southern Oscillation)।
12
12
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি সমুদ্রের তাপমাত্রা রেকর্ড হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় তৈরি হয়েছে বন্যা, খরা ও তীব্র দাবদাহের দুর্যোগ। পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক যে, আগামী ছয় মাসে চরম গরমে বিশ্বে ৩ লক্ষ ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে দাবি ‘ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব’-এর। ভারতেই প্রাণহানির আশঙ্কা ৫৫ হাজার৷