ভুটানে হিমবাহের বরফ গলে তৈরি হওয়া হ্রদগুলি ঘিরে ক্রমশ বাড়ছে উদ্বেগ। পাহাড়ের কোলে জমে থাকা বিপুল জলরাশি যে কোনও সময় ভয়াবহ বন্যার কারণ হতে পারে। প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে হ্রদগুলির জল নেমে এলে বিপর্যস্ত হতে পারে বিস্তীর্ণ এলাকা। বৃহস্পতিবার ভুটানের হিমবাহ হ্রদ ভাঙার ঘটনায় অসম ও উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
2
12
ভুটানের জাতীয় জলবিদ্যা ও আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সে দেশে মোট ৫৬৭টি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টিকে ‘সম্ভাব্য বিপজ্জনক’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগে এই সংখ্যা ছিল ২৫। পরে আটটি হ্রদের ঝুঁকি তুলনামূলক কমে যাওয়ায় বিপজ্জনক হ্রদের সংখ্যা কমিয়ে ১৭ করা হয়েছে।
3
12
হিমবাহ ধীরে ধীরে গলে পাহাড়ের ঢালে তৈরি হওয়া গর্তে জমতে থাকে জল। এ ভাবেই তৈরি হয় হিমবাহ হ্রদ। অনেক সময় পাথর, নুড়ি, বালি ও হিমবাহের জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধে এই হ্রদগুলির জল আটকে থাকে।
4
12
ভূমিকম্প, ভূমিধস, তুষারধস, অতিবৃষ্টির কারণে সেই বাঁধ দুর্বল হয়ে ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ জল, পাথর ও কাদা প্রবল বেগে পাহাড়ের নীচের দিকে নেমে আসে। এই ঘটনাকে বলা হয় গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF)।
5
12
বিজ্ঞানীরা ভুটানের লুনানা অঞ্চলে অবস্থিত থোরথোরমি ও রাফস্ট্রেং হ্রদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। দু’টি হ্রদের মাঝখানে রয়েছে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ। সেটির স্থায়িত্ব নিয়েই আশঙ্কা।
6
12
২০২৩ সালে ‘জার্নাল অফ হাইড্রোলজি’-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই অঞ্চলের বেচুং সো, রাফস্ট্রেং সো, থোরথোরমি সো এবং লুগে সো নামক চারটি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হ্রদ নিয়ে সমীক্ষা করা হয়।
7
12
সমীক্ষা অনুযায়ী, বাঁধ ভাঙলে বন্যার জলের পরিমাণ ৬ লক্ষ ঘনমিটার থেকে ৩০ কোটি ঘনমিটার পর্যন্ত হতে পারে। বিপর্যয় ঘটলে ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং হ্রদ থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
8
12
ভুটানের কাছে যদিও এই আশঙ্কা নতুন নয়। ১৯৯৪ সালের ৬ অক্টোবর লুগে সো হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধের একাংশ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা নেমে এসেছিল। প্রায় ২১ জনের মৃত্যু হয়। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল ব্যাপক।
9
12
২০২৪ সালে প্রকাশিত অন্য একটি রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছে, ২০০৯ সালে সোঝো হ্রদ এবং ২০১৫ সালে লেমথাং সো হ্রদে ভেঙে বন্যা হয়েছিল। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০-এর দশক থেকে ভুটানে অন্তত ১৮টি এমন হিমবাহ হ্রদ ভাঙার ঘটনা ঘটেছে।
10
12
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলছে। ফলে নতুন নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি হচ্ছে, পাশাপাশি পুরনো হ্রদগুলির আয়তনও বাড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পাহাড়ের ঢাল ও বরফে জমাট মাটি দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর ফলে ভূমিধস ও তুষারধসের আশঙ্কাও বাড়ছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা পাথর ও বরফের স্তূপ হ্রদে আছড়ে পড়লেও বাঁধ ভেঙে বিপর্যয় ঘটতে পারে।
11
12
ভুটানের ক্ষেত্রে বিপদ আরও বেশি। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত দেশটির বহু জনবসতি, রাস্তা, কৃষিজমি এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নদী উপত্যকাগুলির আশপাশে অবস্থিত। হ্রদের বাঁধ ভাঙলে এই সব জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
12
12
বিপর্যয় এড়াতে উপগ্রহের মাধ্যমে নজরদারি, সমীক্ষা এবং নদীর জলস্তর পর্যবেক্ষণের মতো ব্যবস্থায় জোর দিয়েছে ভুটান। পাশাপাশি আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও উন্নত করার চেষ্টা চলছে।