মৃত বিড়ালের গায়ে লেগে থাকা দই হল অমৃত, অরণ্যষষ্ঠী থেকে জামাইষষ্ঠী, রীতি রেওয়াজে 'জামাই আদর' কতটা বদলাল?
- 1
- 20
বাঙালি বাড়ি মানেই যে জৈষ্ঠ্য মাসে জামাইষষ্ঠীর ধুম তা কিন্তু নয়৷ অনেক বাঙালি বাড়িতেই জামাই আদরের এই বিশেষ রীতি নেই৷ কেন নেই? কোথা থেকেই বা এল জামাইষষ্ঠী?
- 2
- 20
একটা সময় ছিল যখন জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে শ্বশুরমশাই ফল মিষ্টি দই নিয়ে গিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নিমন্ত্রণ করে আসতেন৷ জামাইষষ্ঠীর দিন দইয়ের হাঁড়ি মিষ্টি কখনও মাছ নিয়ে জামাই আসতেন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে৷
- 3
- 20
সেইসময় যৌথ পরিবারে একাধিক সন্তান৷ খুড়তুতো জেঠতুতো মেয়েরা একসঙ্গে বাপেরবাড়ি আসতেন তাই অনেক জামাই একসঙ্গে দুপুরে পাত পেড়ে খেতে বসতেন৷ শাশুড়িরা নিজের হাতে খাবার পরিবেশন করতেন আর শ্যালিকারা বসতেন পাশে পাখার বাতাস করতে, সেইসঙ্গে হাসি মজা হইহই৷ শ্বশুরমশাইরা জামাইয়ের প্রিয় খাবারের বন্দোবস্ত করতে ব্যস্ত থাকতেন। দিন দুই আগে থেকেই বাঙালি বাড়িতে সাজো সাজো রব৷
- 4
- 20
এই আচার অনুষ্ঠান একেবারেই লৌকিক৷ ধর্মানুষ্ঠানের কোনও যোগ নেই এর সঙ্গে। পূর্ববঙ্গে অরণ্যষষ্ঠী ব্রতের প্রচলন ছিল৷ প্রত্যেক মহিলা যাঁদের সন্তান রয়েছে তাঁরা সকলেই এই অরণ্যষষ্ঠীর ব্রত করত৷ মা ষষ্ঠীকে সন্তানের দেবতা হিসাবে পুজো করা হয়৷ সন্তানের মঙ্গলকামনায় অরণ্যষষ্ঠীর ব্রত করা হত৷
- 5
- 20
অরণ্যষষ্ঠীর ব্রত কেন পালন করা হত? এক ব্রাহ্মণীর তিন ছেলে, তিন বৌ ছিল। ছোটবৌ চুরি করে খাবার খেয়ে পোষ্য কালো বিড়ালকে দোষ দিত৷ জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে অরণ্য ষষ্ঠীর ব্রতের দিন ব্রাহ্মণী ব্রত করবে। পুজোর জন্যে নিজের হাতে পায়েস, মিষ্টি, ক্ষীর ও নাড়ু তৈরি করল। বিড়াল চুরি যেন না করে সেইজন্য ছোটবৌকে খাবার পাহারা দিতে বলে স্নানে গেলেন৷
- 6
- 20
ভাল ভাল খাবার দেখে ছোটবৌ মিষ্টি, ক্ষীর, পায়েস, দই লোভে পড়ে খেয়ে নিল, আর একটু দই নিয়ে বিড়ালের মুখে মাখিয়ে দিল। এদিকে ব্রাহ্মণী স্নান করে এসে দেখল যে, খাবারগুলো সব কে যেন খাবলে খেয়ে গেছে। ছোটবৌ বলল আনমনা হয়ে পড়ায় বিড়াল এসে খেয়ে গিয়েছে৷ এই বলে ছোটবউ বেড়ালটাকে বেশ দু’চার ঘা দিয়ে দিল।
- 7
- 20
ব্রাহ্মণী আবার সব নতুন করে যোগাড় করে পুজোর ব্যবস্থা করল। কিন্তু বিড়াল কাঁদতে কাঁদতে মা ষষ্ঠীর কাছে নালিশ করল। এই ঘটনার কয়েক মাস পরে ছোটবৌয়ের ছেলে হল৷ ছোটবৌ ছেলেকে কোলের কাছে নিয়ে রাতে ঘুমোল৷ সকালে উঠে ছেলেকে কোথাও খুঁজে পেল না৷ এইভাবে ছোটবউয়ের পর পর সাতটি ছেলে আর একটি মেয়ে হল, কিন্তু সব কটিই হারিয়ে গেল।
- 8
- 20
তখন পাড়ার সকলে বলতে লাগল যে, ছোটবউ মানুষ নয় নিশ্চয় রাক্ষসী, ছেলেগুলোকে সেই নিশ্চয় খেয়ে ফেলে। এই কথা শুনে মনের দুঃখে ছোটবৌ নিজেই বাড়ি ছেড়ে একদিন বনে চলে গেল।
- 9
- 20
বনে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল, ‘আমার এ কী হল মা ষষ্ঠী? তুমি আমায় সাতটি ছেলে আর একটি মেয়ে দিয়েও সব কেড়ে নিলে কেন মা! ছোটবউকে এইভাবে আক্ষেপ করতে দেখে মা অরণ্য ষষ্ঠীর দয়া হল, তখন তিনি এক বুড়ীর রূপ ধরে তার কাছে এলেন।
- 10
- 20
মা ষষ্ঠী বললেন, বিড়ালের নামে মিথ্যে অপবাদ দেওয়ার জন্যই এই দুর্দশা৷ পথের ধারে মরা বেড়াল পচে পড়ে রয়েছে। যদি এক হাঁড়ি দই ওই বেড়ালটার গায়ে ঢেলে দিয়ে সেই দই জিভ দিয়ে চেটে ফের হাড়িতে রাখতে পারো, তবে তোমার সব ছেলে-মেয়ে আবার ফিরে পাবে। ছোটবৌ দেরি না করে মা ষষ্ঠীর কথামতো তাই করল৷
- 11
- 20
মা ষষ্ঠী বললেন এই দই অমৃত৷ ছেলেমেয়েকে ফিরে পেয়ে মা ষষ্ঠীর কথায় হাড়িতে রাখা অমৃত দই দিয়ে ছোটবৌ ফোঁটা দিল সন্তানের কপালে৷ মা ষষ্ঠী বললেন, আমার বাহনকে আর মিথ্যে দোষ দিও না৷ কেউ তাড়িয়ে দিচ্ছে দেঝলে ষাট ষাট করো৷ মা অরণ্যষষ্ঠী অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
- 12
- 20
ছোটবৌ তখন তার সাত ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে ষষ্ঠীদেবীর মাহাত্ম্যের কথা বললেন৷ মা ষষ্ঠীর কৃপায় ছেলেমেয়েফের ভাল ঘরে বিয়েও হল। পরের বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে শুক্লপক্ষে ষষ্ঠী তিথিতে খুব জাঁকজমক করে ছোটবৌ অরণাষষ্ঠীর ব্রত করল এবং মেয়ে-জামাইকে আনিয়ে জামাইয়ের কপালে দইয়ের ফোঁটা দিল।
- 13
- 20
সেই থেকে মা অরণ্যষষ্ঠীর দিন জামাই আদরের প্রচলন৷ জ্যৈষ্ঠমাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে মহিলারা এক হাতে পাখা নিয়ে বনের মধ্যে বিন্ধ্যবাসিনী ষষ্ঠীদেবীর আরাধনা করতেন৷ ফল ফুল দিয়ে পুজো করে তুষ্ট করতেন সুস্থ সন্তানলাভের আশায়৷ সময় বদলেছে৷ এখন আর বনে নয়, ঘরের মধ্যেই বাড়ির মধ্যে বটের ডাল পুতে তার তলায় পিটুলি,হলুদবাটা ও ভুষো কালি দিয়ে ষষ্ঠী দেবী, তার বাচ্চাকাচ্চা ও বাহন বিড়ালের মূর্তি তৈরি করে পুজো করা হয়। পুজো শেষে ব্রতকারিণীরা বটপাতার উপরে রাখা ষষ্ঠীদেবীর সন্তানসন্ততির মূর্তিগুলো হাতে নিয়ে ব্রতকথা শুনতেন।
- 14
- 20
কিন্তু যে সব বাড়িতে জামাইষষ্ঠী পালনের রেওয়াজ নেই তারা সন্তানের মঙ্গলকামনায় কী করেন? শোনা যায়, জামাইষষ্ঠীর সঙ্গে মৃত্যু বা এমন কোনও খারাপ স্মৃতি জুড়ে গিয়েছে যে তারপর থেকেই এই ব্রতপালনে ইতি টানা হয়েছিল।
- 15
- 20
জামাই শব্দটির গভীরে আছে 'জামি' শব্দটি৷ যার অর্থ এয়োস্ত্রী বা সধবা নারী৷ জামির বহুবচন জাময়ঃ। এখান থেকেই সম্ভবত জাময়ঃষষ্ঠীর প্রচলন৷
- 16
- 20
যদিও এর অন্য কারণও রয়েছে৷ পুরনো দিনে মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘন ঘন বাপের বাড়ি আসতে পারত না৷ জামাই শ্বশুরবাড়িতে আসত না প্রায়৷ মেয়ের সঙ্গে বাচ্চা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসও থাকত।
- 17
- 20
সেখান থেকেই জামাইষষ্ঠীর দিন মেয়ে জামাই নাতি নাতনি একসঙ্গে আসার প্রচলন হল৷ সেই থেকেই বছরের বিশেষ দিন শ্বশুরবাড়িতে জামাই আসায় জামাইয়ের খাতির করা হত মহাভোজের মাধ্যমে৷
- 18
- 20
বাড়ি থেকে রেস্তোরাঁ: সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উদযাপনেও এসেছে কিছু বদল৷ এখন জেন ওয়াই জামাই এর খাতির করতে শাশুড়িরা আগে থেকেই শহরের বড় কোনও রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করে রাখেন৷ একা হাতে বহু পিদ রান্না করা ঝক্কির৷
- 19
- 20
আগে যৌথ পরিবারে মা কাকিমারা একসঙ্গে হাতে হাতে করতেন৷ এখন ছোট পরিবার৷ শাশুড়ির একার পক্ষে এই ধকল নিতে হলে উৎসবের আনন্দ আর উপভোগ করা হয় না৷ তাই বাঙালি চাইনিজ মোগলাই জামাইয়ের পছন্দ মতো সব রকম খাবার সাজিয়ে দেয় রেস্তোরাঁ।
- 20
- 20











