মহাবিশ্বে পৃথিবীর বাইরে অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, সেই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বরাবরই এক বড় সমস্যার মুখোমুখি হন। কোনও গ্রহ প্রাণধারণের উপযোগী হলেও তা যদি শত শত আলোকবর্ষ দূরে থাকে, তবে বর্তমান প্রযুক্তিতে তার বায়ুমণ্ডল পরীক্ষা করা বা সেখানে প্রাণের সন্ধান চালানো কার্যত অসম্ভব।
2
11
কিন্তু এবার সেই চেনা সমীকরণ বদলে দিতে হাজির হয়েছে এক নতুন মহাজাগতিক প্রতিবেশী। পৃথিবী থেকে মাত্র ২৫ আলোকবর্ষ দূরে মহাকাশবিজ্ঞানীরা সন্ধান পেয়েছেন এক সম্ভাব্য বাসযোগ্য পাথুরে ‘সুপার-আর্থ’-এর, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জিজে ৩৩৭৮বি’ (GJ 3378b)। এই আবিষ্কার নিয়ে অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত গবেষক দলের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া আরভিনের ড. পল রবার্টসন।
3
11
ক্যামেলোপার্ডালিস (Camelopardalis) বা জিরাফ নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত একটি অনুজ্জ্বল লাল বামন (Red Dwarf) নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে এই নতুন গ্রহটি। এটি প্রতি ২১.৪৫ দিনে নিজের নক্ষত্রকে একবার সম্পূর্ণ প্রদক্ষিণ করে। বিজ্ঞানীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গ্রহটির ভর পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ২.৩ গুণ এবং এর ব্যাস পৃথিবীর প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ এটি পৃথিবীর চেয়ে আকারে বড় ও ভারী হলেও, কোনও গ্যাসীয় দানব গ্রহ নয়, বরং একটি পাথুরে পৃথিবী।
4
11
সবচেয়ে আশাব্যাঞ্জক বিষয় হল, এই সুপার-আর্থটি তার নক্ষত্রের এমন এক আদর্শ দূরত্বে বা ‘হ্যাবিটেবল জোনে’ অবস্থান করছে, যেখানে তাপমাত্রা খুব বেশি গরম বা প্রচণ্ড ঠান্ডা নয়। ফলে এর পৃষ্ঠে তরল জলের অস্তিত্ব থাকা ভৌত নিয়মানুযায়ী সম্পূর্ণভাবে সম্ভব। গ্রহটি তার নক্ষত্র থেকে ঠিক ততটুকুই আলো ও বিকিরণ পায়, যতটুকু পৃথিবী সূর্য থেকে পেয়ে থাকে (পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ)।
5
11
এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পেছনে কাজ করেছে বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল দুটি স্পেক্ট্রোগ্রাফ যন্ত্র। টেক্সাসের ম্যাকডোনাল্ড অবজারভেটরির হবি-এবারলি টেলিস্কোপে থাকা ‘হ্যাবিটেবল-জোন প্ল্যানেট ফাইন্ডার’ এবং অ্যারিজোনার কিট পিক ন্যাশনাল অবজারভেটরির উইন (WIYN) টেলিস্কোপের ‘NEID স্পেক্ট্রোমিটার’ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গ্রহটির খোঁজ মিলেছে।
6
11
ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিনের ড. মাইকেল এন্ডল এবং ইউসি আরভিনের ড. পল রবার্টসনের যৌথ নেতৃত্বে একদল গবেষক এই সাফল্যের কথা ‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’-এ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের গবেষণাপত্রটির উপশিরোনাম দেওয়া হয়েছে—‘আ প্ল্যানেট স্ট্র্যাডলিং দ্য কসমিক শোরলাইন’ বা মহাজাগতিক সমুদ্রসৈকতের সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক গ্রহ।
7
11
গ্রহ বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘শোরলাইন’ বা সমুদ্রসৈকত বলতে এমন এক সীমানাকে বোঝায়, যার একদিকে থাকে সেইসব গ্রহ যারা নিজেদের বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে সক্ষম, আর অন্যদিকে থাকে বায়ুমণ্ডলহীন রুক্ষ পাথুরে পিণ্ড। ‘জিজে ৩৩৭৮বি’ ঠিক এই জলবিভাজিকার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। এটি আকারে বড় হওয়ায় এর মহাকর্ষীয় টান বায়ুমণ্ডল ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু লাল বামন নক্ষত্রগুলি স্বভাবগতভাবেই সূর্যের চেয়ে অনেক বেশি চৌম্বকীয়ভাবে সক্রিয় ও বিপজ্জনক হয়।
8
11
এরা প্রতিনিয়ত শক্তিশালী অতিবেগুনি ও এক্স-রে বিকিরণ এবং তীব্র সৌরঝড় নির্গত করে, যা কোটি কোটি বছরে একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে মহাকাশে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ফলে, নক্ষত্রের এই অনবরত আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়েও গ্রহটি নিজের বায়ুমণ্ডল কতটা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন।
9
11
বর্তমানে সচল বা নির্মাণাধীন কোনও টেলিস্কোপই এই প্রশ্নের সুনিশ্চিত উত্তর দিতে পারবে না। তবে মাত্র ২৫ আলোকবর্ষ দূরত্বে থাকায় এই গ্রহটি আমাদের এতটাই কাছে যে, অদূর ভবিষ্যতে বায়ুমণ্ডলীয় গবেষণার জন্য এটিই বিজ্ঞানীদের প্রধান লক্ষ্য হতে চলেছে। বিখ্যাত জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ হয়তো এর বায়ুমণ্ডলের কিছু প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে।
10
11
তবে আসল সুযোগ আসবে ২০৪০-এর দশকে, যখন নাসা মহাকাশে উৎক্ষেপণ করবে তাদের স্বপ্নের ‘হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি’। এই বিশালাকার স্পেক্ট্রোমিটার যুক্ত দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি বিশেষভাবে তৈরিই করা হচ্ছে আমাদের কাছের নক্ষত্রগুলির পাথুরে গ্রহের সরাসরি ছবি তুলতে এবং সেখানে বায়োসিগনেচার বা জৈবিক সক্রিয়তার রাসায়নিক সংকেত বিশ্লেষণ করতে।
11
11
আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে কাছে (৪.২ আলোকবর্ষ দূরে) থাকা ‘প্রক্সিমা সেন্টরি বি’-র মতো গ্রহগুলির বাসযোগ্যতা নিয়ে যেখানে বিতর্ক চলছে, সেখানে ‘জিজে ৩৩৭৮বি’ বিজ্ঞানীদের সামনে এক নতুন আশার আলো দেখাল। আগামী প্রজন্মের টেলিস্কোপগুলি যখন মহাকাশে চোখ মেলবে, তখন ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার জন্য এই নতুন সুপার-আর্থটিই হবে পৃথিবীর অন্যতম সেরা বাজি।