প্রজাতন্ত্র দিবসে ভারতীয় বায়ুসেনার (IAF) বহুল প্রতীক্ষিত আকাশ প্রদর্শনীর প্রস্তুতির পাশাপাশি রাজধানী দিল্লির আকাশ সুরক্ষিত রাখতে দিল্লির মাটিতে চলছে অত্যন্ত পরিকল্পিত এক অভিযান। পাখির সঙ্গে বিমানের সংঘর্ষ, অর্থাৎ ‘বার্ড স্ট্রাইক’ এড়াতে দিল্লি বন দপ্তর ও বায়ুসেনার যৌথ উদ্যোগে শহরজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ মাংস। এই বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় মোট প্রায় ১,২৭০ কেজিরও বেশি হাড়ছাড়া মুরগির মাংস ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে দিল্লির আকাশে বহুল পরিচিত ব্ল্যাক কাইট বা চিল পাখিদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
2
7
দিল্লির শহুরে আকাশে ব্ল্যাক কাইটের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। এরা বড় আকারের শিকারি পাখি এবং সাধারণত নিচু উচ্চতায় ওড়ার সময় রাফাল বা সুখোই-৩০ এমকেআইয়ের মতো যুদ্ধবিমানের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই ঝুঁকি কমাতেই প্রতি বছর প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে ‘মিট-থ্রোয়িং’ বা নির্দিষ্ট জায়গায় মাংস ছড়িয়ে পাখিদের অন্যদিকে আকৃষ্ট করার কৌশল নেওয়া হয়।
3
7
এই উদ্যোগের পিছনে রয়েছে পাখিদের স্বাভাবিক আচরণ ও সামরিক কৌশলের সমন্বয়। ব্ল্যাক কাইট সাধারণত খোলা জায়গা ও নির্ভরযোগ্য খাদ্যের উৎসের দিকে আকৃষ্ট হয়। সেই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে উড়ানপথ থেকে দূরে শহরের ২০টি নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়মিত মাংস দেওয়া হচ্ছে। ফলে পাখিরা সেখানে খাবার পেয়ে নিচু উচ্চতাতেই ব্যস্ত থাকে এবং সেই উচ্চতায় ওঠে না, যেখানে বায়ুসেনার যুদ্ধবিমানগুলি প্রদর্শনী করে।
4
7
চলতি বছর এই অভিযানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতদিন যেখানে মহিষের মাংস ব্যবহার করা হত, এবার প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে হাড় ছাড়া মুরগির মাংস। বন দপ্তরের আধিকারিকদের মতে, এই পরিবর্তন করা হয়েছে বন্যপ্রাণ ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োগ, দু’দিক থেকেই আরও কার্যকর ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য। জানুয়ারি ১৫ থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির অধীনে ২০ থেকে ৩০ গ্রাম ওজনের ছোট ছোট মাংসের টুকরো ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে পাখিরা সহজেই সেখানে আকৃষ্ট হয়।
5
7
এই বিশাল কর্মসূচির জন্য পর্যায়ক্রমে মোট ১,২৭৫ কেজি মাংস পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ওয়াজিরাবাদের ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ধরা হয়েছে জানুয়ারি ২২ প্রজাতন্ত্র দিবসের পূর্ণাঙ্গ মহড়া বা ফুল ড্রেস রিহার্সালের দিন। ওই দিন একাই প্রায় ২৫৫ কেজি মাংস ছড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে সবচেয়ে ব্যস্ত উড়ানপর্বে পাখিদের দূরে রাখা যায়।
6
7
খাবার দেওয়ার জায়গাগুলিও নির্ধারণ করা হয়েছে বহু বছরের পাখির গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে। লালকেল্লা ও জামা মসজিদের মতো এলাকায় ব্ল্যাক কাইটের ঘনত্ব বেশি থাকায় সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মান্ডি হাউস, দিল্লি গেট সংলগ্ন এলাকাকেও চিহ্নিত করা হয়েছে ‘হটস্পট’ হিসেবে। প্রজাতন্ত্র দিবসের আগের কয়েক দিন ধরে এই নির্দিষ্ট জায়গাগুলিতে নিয়মিত খাবার দিয়ে পাখিদের মধ্যে একটি অভ্যাস তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তারা ওই এলাকাতেই খাবারের আশায় ঘোরাফেরা করে।
7
7
কর্তব্যপথের উপর দিয়ে যখন বায়ুসেনার যুদ্ধবিমান গর্জন তুলে উড়ে যাবে, তখন আড়ালে এই নীরব কিন্তু অদ্ভুত কৌশলই রাজধানীর আকাশ সুরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভরসা হয়ে থাকবে। অচেনা হলেও এই ‘মাংস ছড়িয়ে আকাশ রক্ষা’ অভিযান এখন দিল্লির সমন্বিত আকাশ নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।