ছবির কেন্দ্রে রয়েছেন অশীতিপর মৃৎশিল্পী কুঞ্জবিহারী পাল, যাঁর চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিমাই ঘোষ। কুমোরটুলির এই প্রবীণ শিল্পী কেবল একজন মানুষ নন, বরং একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। তাঁর তৈরি মূর্তি বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছেছে নিউ জার্সি ও জর্জিয়ার মতো বিদেশের মাটিতেও। কিন্তু এ বছর দুর্গাপুজোর ঠিক আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকদের কড়া নিষেধে তাঁকে মূর্তি তৈরির কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব।
শিল্পীর জীবনে কাজই যখন আত্মপরিচয়, তখন সেই কাজ থেকে দূরে থাকা কি তাঁকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলে? প্রশ্নটা শুধু কাজ হারানোর নয়, অস্তিত্ব হারানোরও। এই দোলাচলই ‘কারুবাসনা’র আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।
কুঞ্জবিহারী পালের কন্যা চারুমতী পাল (গার্গী রায় চৌধুরী) মায়ের অনুপস্থিতিতে বাবার ঘর ও কাজ, দুটোরই ভার কাঁধে তুলে নেয়। সে নিজেও বাবার প্রধান শিষ্যদের একজন। অন্যদিকে রয়েছে শিবেন (চয়ন দে) আরেক প্রধান শিষ্য, চারুমতীর সঙ্গে বেড়ে ওঠা তাঁর। গুরুকন্যার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানও গভীর। কুঞ্জ চান তাঁর জীবনের দুই গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে এক সূত্রে বাঁধতে। কিন্তু শিবেন সম্মানের সঙ্গে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। কেন এই প্রত্যাখ্যান? এই প্রত্যাখ্যানের আসল কারণ কী? কোথায় সেই অদৃশ্য দ্বন্দ্ব, যা সম্পর্কের স্বাভাবিক গতিকে থামিয়ে দেয়? সেইসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতেই এগোয় ছবির গল্প।
‘কারুবাসনা’ শুধু পারিবারিক সম্পর্ক বা শিল্পীর সংকটের গল্প নয়। এটি একজন শিক্ষানবিশ শিল্পীর গভীর ব্যাকুলতার কথাও বলে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদ, সেই তাগিদে হারিয়ে ফেলা প্রিয় মানুষ, মূল্যবান সম্পর্ক ও জীবনের সূক্ষ্ম ভারসাম্য। চাওয়া আর হারানোর এই সংঘাত শিল্পী-মনকে কীভাবে ক্ষতবিক্ষত করে, সেই যাত্রাই সংযত ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছে ছবিটি।
এই ছবির প্রসঙ্গে অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই ছবির সঙ্গে যুক্ত কেউই কোনও পারিশ্রমিক নেননি। নিঃস্বার্থ ও সম্মিলিত পরিশ্রমে নির্মাতাদের একটাই উদ্দেশ্য—দর্শকের হাতে একটি সৎ ও আন্তরিক কাজ তুলে দেওয়া।
‘কারুবাসনা’-র প্রথম প্রদর্শনী হতে চলেছে আগামী ২৩ জানুয়ারি, ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক কলকাতা শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। রোটারি সদনে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে ছবিটি প্রদর্শিত হবে।
শিল্প কি কেবল হাতে বাঁচে না কি হৃদয়ে? সেই প্রশ্নই তোলে ‘কারুবাসনা’।
