যে সময়ে তিনি একের পর এক হিট দিচ্ছেন, তারকা হওয়ার দৌড়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছেন হিন্দি ছবির তাবড় নামগুলোর সঙ্গে, ঠিক তখনই এমন এক সিদ্ধান্ত নিলেন বিনোদ খান্না, যা স্তম্ভিত করে দিয়েছিল গোটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে। খ্যাতি, অর্থ, দর্শকের উন্মাদ ভালবাসা- সবকিছুকে পেছনে ফেলে তিনি হেঁটে গিয়েছিলেন একেবারে অন্য পথে। সিনেমার জন্য নয়, জীবনের অর্থ খুঁজতে। আধ্যাত্মিকতার টানে।
বছর পেরিয়ে সেই সিদ্ধান্তের নেপথ্যের গল্প এবার প্রকাশ্যে আনলেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী কবিতা খান্না। কবিতা জানিয়েছেন, বিনোদের এই ঝোঁক কোনও হঠাৎ উন্মাদনা ছিল না। বরং আধ্যাত্মিকতা তাঁর ব্যক্তিত্বের গভীরেই প্রোথিত ছিল বহুদিন ধরে। কবিতার কথায়, “বিনোদ ছোটবেলা থেকেই ভীষণ আধ্যাত্মিক ছিলেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ আ যোগী’ বইটি কিনেছিলেন। মজার ব্যাপার, তখন তিনি বুঝতেই পারেননি যে ওশো সেই সময়ে একই বইয়ের দোকানেই ছিলেন।”
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, ঠিক কী এমন ঘটেছিল, যার পর দেশের অন্যতম বড় তারকা সব ছেড়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন? কবিতার বক্তব্য অনুযায়ী, জীবনের সেই বাঁক আসে একের পর এক ব্যক্তিগত শোকের অভিঘাতে। “দু’বছরের মধ্যে পরিবারের একাধিক মৃত্যু বিনোদকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। বিশেষ করে মায়ের মৃত্যু তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তখনই তিনি ওশোর কাছে গিয়ে সন্ন্যাস নেন,” বলেন কবিতা।
তবে সেই সময়ের প্রথম সারির এই বলি তারকার এহেন সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই ছিল দুর্বোধ্য। জনপ্রিয়তার শিখরে থাকা একজন অভিনেতা কেন সব ছেড়ে দেবেন? কিন্তু বিনোদের কাছে এটি কিন্তু ছিল না সাফল্য থেকে পালিয়ে যাওয়া। বরং এ ছিল জীবনের প্রকৃত অর্থ খোঁজার যাত্রা।
ভারত ছেড়ে আমেরিকার ওরেগনে ওশোর আশ্রমে পৌঁছে বিনোদ খান্নার জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। কবিতার কথায়, সেখানে তিনি ছিলেন ওশোর বাগান পরিচর্যাকারী। “ওশোর বাড়ি ছিল একেবারেই ব্যক্তিগত এলাকা। খুব কম মানুষই সেখানে প্রবেশের অনুমতি পেত। কিন্তু বাগান দেখাশোনার দায়িত্বে থাকায় বিনোদ সেখানে যেতেন। এটাই ছিল তাঁর সেবা।”
এখানেই শেষ নয়। কবিতা জানান, ওশোর জন্য বিশেষভাবে তৈরি পোশাকগুলো প্রথমে পরানো হত বিনোদকেই। কারণ, দু’জনের কাঁধের গড়ন ছিল প্রায় এক। বিনোদের শরীরেই পরীক্ষা হত সেই পোশাকগুলোর ফিটিং।
তবে এই আধ্যাত্মিক যাত্রা ওরেগনে যাওয়ার অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। কবিতা স্মৃতিচারণায় বলেন, “মুম্বইয়ে থাকাকালীন চৌপাট্টি বিচে নগ্ন ধ্যানের আসরে অংশ নিতেন তিনি! শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে, চারপাশের সব কোলাহল উপেক্ষা করে।” তবে বিনোদের উদ্দেশ্য নিয়ে কোনও ভুল ব্যাখ্যা যেন না হয়, সে কথাও স্পষ্ট করেছেন কবিতা। “আমি নিশ্চিত, বিনোদ সেখানে কোনও শারীরিক অনুসন্ধানের জন্য যাননি। তাঁর যাত্রা ছিল সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক। পূর্ণ নিষ্ঠা আর গভীর বিশ্বাস নিয়ে।”
বিনোদ খান্নার জীবন তাই শুধু এক সুপারস্টারের উত্থান-পতনের গল্প নয়। তা এক মানুষের অন্তর্লোকের সন্ধানের গল্পও বটে, যেখানে সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়েও তিনি বেছে নিয়েছিলেন নির্জনতা, খ্যাতির বদলে আত্মার শান্তি।
