চারিদিকে প্রেমের গন্ধ। শহর জুড়ে ভালবাসার মরশুম। প্রেম কি এক দিনের? তর্ক থাকুক। তবু বিক্ষোভ, ঝগড়ায় উঁকি মারা দুনিয়ায় একদিনের জন্য হলেও একমুঠো ভালবাসা উদ্যাপন বর্তমানে প্রায় উৎসবের আকার ধারণ করে। আজ যেমন প্রপোজ ডে, যা বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ৮ ফেব্রুয়ারি। এই দিনেই বুক ভরে কথা বলার সাহস জোগাড় করেন প্রেমিক-প্রেমিকারা, খুলে দেন হৃদয়ের দরজা। এই উপলক্ষেই আজকাল ডট ইন-এর ভাবনা ছিল টলিপাড়ার সেই সব পরিচিত মুখদের নিয়ে, যাঁরা ভালবেসে পরস্পরকে বিয়ে করেছেন, যাঁদের দাম্পত্য পেরিয়েছে দীর্ঘ সময়ের পথ। এতগুলো বছর পরেও তাঁদের কাছে রোম্যান্স কেমন? আজও কি ভালবাসা বলার ইচ্ছে জাগে? আর সুযোগ পেলে কীভাবেই বা জানাতে চান মনের কথা?এই ভাবনার কেন্দ্রে টলিপাড়ার অন্যতম জনপ্রিয় ও পরিণত জুটি -কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও লাবণী সরকার।
অল্প কথায় নিজস্ব ছন্দে কৌশিক বললেন, “ টু বি ভেরি ফ্র্যাঙ্ক এই বয়সে রোম্যান্স সেইভাবে আসে না। আসে না বলতে ওরকম দুরন্ত নদীর স্রোতের মতো আসে না। মানে, একজন বছর কুড়ি বয়সের ছেলের মধ্যে যেমন গাম্ভীর্যের বদলে খানিক ছেলেমানুষি, ভরপুর রোম্যান্স থাকা উচিত তেমনই আমার বয়সে পৌঁছলে ছটফটানি অনেকটাই কমে যায়। জীবনের নিয়মেই। আমার তো মনে হয়, যে বয়সে যেমন ঠিক তেমন থাকার মধ্যেই একটা নীরব রোম্যান্টিকতা লুকিয়ে রয়েছে। মানে সেই পরিবর্তনটাকে গ্রহণ করা ও সেইভাবে বাঁচার মধ্যেই তো রোম্যান্সের সৌন্দর্য। খানিক থামলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা।
এরপর আবার বলা শুরু করলেন। কথার সুরে কোনও আক্ষেপ নেই। বরং রয়েছে এক ধরনের শান্ত স্বীকৃতি। কৌশিক বললেন, “তবে হ্যাঁ, সঙ্গে এটাও বলব লাবণী তো শুধুই আমার স্ত্রী নয়। ও আমার বন্ধু, কম্প্যানিয়ন, পার্টনার যাই-ই নাম দিন না কেন। আমরা ঘুরতে খুব ভালবাসি। আমি খুব কম জায়গা দেখেছি। এতটুকু বিনয় করে বলছি না। তবু বলছি দেশে-বিদেশে যত জায়গাতেই ঘুরেছি তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হল প্যারিস শহর। সৌন্দর্য এবং রোম্যান্সের দু'টি তাজ যেন কেউ যত্ন করে এই শহরের মাথায় কেউ পরিয়ে দিয়েছে। লাবণী ও আমার ছেলের সঙ্গে বছর ১২ আগে প্যারিস ভ্রমণে গিয়েছিলাম। ঘোরাটা আমার সবসময় সপরিবারেই হয়। কখনওই একা ঘুরতে যাই না আমি কোথাও...যাই হোক, রাতের প্যারিস যিনি দেখেননি, তাঁকে শুধু শব্দে সেই সৌন্দর্যের বর্ণনা করা অসম্ভব। স্রেফ অসম্ভব...যেন আলোয় মোড়া এক টুকরো স্বপ্নপুরী। লাবণী ও আমাদের ছেলেকে নিয়ে যখন আইফেল টাওয়ারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, বিশ্বাস করুন ওর থেকে রোমান্টিক জায়গা আর হয় না। আমরা লিফটে চেপে ওর উপরেও গিয়েছিলাম। সেখান থেকে গোটা প্যারিস শহরটাকে অবাক হয়ে দেখেছিলাম। আজও সেই দৃশ্য চোখে ভাসে।”
শেষে অকপটে স্বীকারোক্তি অভিনেতার, “যদি সুযোগ পাই আবার লাবণীকে নিয়ে অন্তত একবার প্যারিসে নিয়ে যেতে চাই। আর আইফেল টাওয়ারের সামনে ওই এক টুকরো সবুজ ঘাসের লনে ওর হাত ধরে বলতে চাই, ‘আমি তোমাকে ভালবাসি।’”
অন্যদিকে, অভিনেত্রী লাবণী সরকার রোম্যান্সকে দেখেন আরও বিস্তৃত চোখে। শুধুই টাকা উপার্জন, বিলাসবহুল জীবনযাত্রার মধ্যে কখনওই আটকে থাকতে চাননি অভিনেত্রী লাবণী। টলিপাড়ার অন্যতম এই ব্যক্তিত্ব নিজের ব্যক্তি জীবনকে জীবনের আসল রঙে রাঙান। সুন্দরবনের একটি প্রান্তিক স্কুলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি একাধিক শিশুর দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। আজকাল ডট ইন-কে তিনি স্পষ্ট কথায় বললেন, " একেকজনের জীবনে তো একেকভাবে রোম্যান্স আসে। আর রোম্যান্স জীবনে শুধু একবারই আসে-এমন ধারণায় আমি অন্তত বিশ্বাস করি না। কোনও সুন্দর সন্ধ্যায় ভীষণ আকর্ষণীয় একজন পুরুষকে দেখে আমার ভাল লাগতেই পারে -সেটাও তো রোম্যান্স। তাই না? বলতে চাইছি, রোম্যান্টিকতাকে না কোনও বাঁধাধরা নারী-পুরুষ-শারীরিক আকর্ষণ-এর মানদণ্ডে মাপতে আমি নারাজ। রোম্যান্টিকতার মধ্যে প্রকৃতির নিজস্ব একটা গন্ধ লুকিয়ে থাকে। একটু খুলে বলি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম, তাঁর সঙ্গে বকুল গাছের তলায় বসে গল্প-আড্ডা মারতাম, কবিতা পড়তাম। তাই রোম্যান্টিকতা বলতে আজও আমার কাছে বকুল ফুলের স্মৃতি আসে...”
বলতে বলতে খানিক থামলেন শিল্পী। কথা শেষ করতে গিয়ে লাবণীর কণ্ঠে ধরা পড়ল জীবনের প্রতি গভীর ভালবাসা।, “এই বয়সে পৌঁছে মনে হয় জীবনের থেকে সুন্দর আর কিচ্ছু নেই। কিচ্ছু হতে পারে না। জীবনকে ভালবাসলেই রোম্যান্টিকতার গন্ধ পাওয়া যায়, তাকে অনুভব করা যায়। আর কৌশিকের বিষয়ে বলব, কী বয়স তো হচ্ছে আমাদের দু'জনেই, যদিও ও ভীষণ ফিট। তবু কিছু কিছু বয়সজনিত অসুস্থতা তো আমাদের দু'জনের মধ্যেই অল্প অল্প করে থাবা বের করেছে তাই ওর খেয়াল রাখাটাও আমার কাছে রোম্যান্টিকতা। অথবা ধরুন, আমরা পরস্পরকে কিছু না বলে দু'জনের মনের কথা বুঝে ফেলা...পরস্পরকে সম্মান দেওয়া, আমাদের পার্থক্যকে যেন সম্মান জানাতে পারি দু'জনে...আমার কাছে না এটাই রোম্যান্টিকতা।”
&t=313s
একেবারে শেষে হেসে যোগ করলেন, “তাই আলাদা করে প্রপোজ ডে-তে প্রপোজ করার ব্যাপারটা আমার কাছে খুব জরুরি নয়। আর হ্যাঁ, কৌশিক কিন্তু দারুণ গান গায়। ওর গলায় গান শুনতে আমি খুব ভালবাসি।”
